Bhawalnews24
জাতীয়

‘বাংলাদেশে পানি জীবন-মরণের বিষয়’:প্রধানমন্ত্রী

‘বাংলাদেশে পানি জীবন-মরণের বিষয়’:প্রধানমন্ত্রীমাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তন ও মহামারিকে মানবজাতির জন্য অভিন্ন হুমকি অভিহিত করে বলেছেন, এগুলো মোকাবিলায় একটি পরিচ্ছন্ন, সবুজ ও নিরাপদ বিশ্ব গড়ে তুলতে সকলের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা ফিনান্সিয়াল টাইমসে গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়।

প্রধানমন্ত্রীর পুরো নিবন্ধটি তুলে ধরা হলো :

বাংলাদেশে পানি জীবন-মরণের বিষয়

আমার দেশ নদীমাতৃক দেশ। উপকূলীয় ও নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বহু লোক বাস করে। কিন্তু ২০২০ সালে আমাদের নজিরবিহীন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

গত মে মাসে সাইক্লোন আম্ফান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হেনে এর গতিপথে ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রেখে গেছে। এরপর মৌসুমি বৃষ্টিপাতে দেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। ফলে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ শস্যের ক্ষতি হয়েছে।

জলবায়ু, স্বাস্থ্য এবং প্রকৃতির আমরা একটি ত্রিমুখী গ্রহগত জরুরি অবস্থা, সংকটের মুখোমুখি। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি জলবায়ু পরিবর্তনের মাধ্যমে ত্বরান্বিত হয় এবং তা আরো বাড়িয়ে তোলে।

আমি সেসব দেশকে সতর্ক করতে চাই, যাঁরা মনে করেন তাঁরা জলবায়ু সংকট থেকে মুক্ত, ব্যাংকার এবং অর্থলগ্নিকারীদের কাছে যাঁরা মনে করেন তাঁরা এটি থেকে রক্ষা পাবেন: আপনি পারবেন না। কভিড-১৯ দেখিয়েছে কোনো দেশ বা ব্যবসা একা টিকে থাকতে পারে না। যা ২০২০ সালকে এমনভাবে তৈরি করেছে যেখানে আমরা অবশ্যই বিজ্ঞানীদের কথা শুনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রকৃতির ক্রোধ বাংলাদেশ একা অনুভব করছে না। এ বছর আমাজন, অস্ট্রেলিয়া, ক্যালিফোর্নিয়া এবং সাইবেরিয়ায় দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় এবং হ্যারিকেন যুক্তরাষ্ট্র, ক্যারিবিয়ান এবং এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে আঘাত হেনেছে। আগামী বছর জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলন সিওপি-২৬-এর আয়োজক যুক্তরাজ্যও বন্যার সম্মুখীন।

জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের ক্রিয়াকলাপের স্থায়িত্বের অভাব থেকে উদ্ভূত হয়। আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ, ভূমিধস এবং খরা আরো বেশি বিরূপ ও তীব্রতার সঙ্গে উপলব্ধি করছি যা খাদ্য সুরক্ষাও বিপন্ন করে। আমাদের এগুলোর গুরুত্ব স্বীকার করতে হবে।

সমুদপৃষ্ঠের এক মিটার বৃদ্ধি অনেক ছোট ছোট দ্বীপ এবং উপকূলীয় দেশগুলোকে নিমজ্জিত করবে। গলে যাওয়া হিমবাহ থেকে বন্যা হিমালয়ের দেশগুলোতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। কয়েক কোটি মানুষ জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হবে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা পৃথিবীর নেই।

ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের বর্তমান সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য দ্রুত অভিযোজনে অর্থ ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জি-২০ এর কাছ থেকে আরো সমর্থন চাইছে।

জি-২০ দেশগুলো প্রায় ৮০ শতাংশ নির্গমনের জন্য দায়ী এবং নিচের দিকের ১০০টি দেশ মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নির্গমন করে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি থামাতে নিঃসরণকারী দেশগুলোর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রয়েছে এবং তাদের নিঃসরণ প্রয়োজনীয় হ্রাসের মাধ্যমে বৃহত্তর অবদান রাখতে হবে।

এই গ্রুপে বাংলাদেশ বিরূপ আবহাওয়ার জন্য অন্যতম সেরা প্রস্তুত দেশ। আমরা সমুদ্রপ্রাচীর নির্মাণ করছি, ম্যানগ্রোভ বন রোপণ করছি, সকল সরকারি কাজে স্থিতিস্থাপকতা যুক্ত করছি।

তবে, আমরা এই যাত্রায় একা চলতে পারি না। ৬৪টি দেশ এবং ইইউ এই সপ্তাহে পৃথিবীর জরুরি পরিস্থিতিতে সাড়া দেওয়ার জন্য ‘নেচার টু রেসপন্ড’ অঙ্গীকারে স্বাক্ষর করেছে। তারা প্রায় ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন মানুষের এবং বিশ্বব্যাপী মোট দেশজ উৎপাদনের এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। সেখান থেকে আমাদের অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পর্যায়ে অভিন্ন রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি করা দরকার। পরবর্তী সিওপি, জি-৭ এবং জি-২০ সভাগুলোর আয়োজক হিসাবে, যুক্তরাজ্য এবং ইতালিকে অবশ্যই এই এজেন্ডাটি পরিচালনা করতে হবে, এজন্য প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য একটি ব্যাপক সমর্থন প্যাকেজ দরকার।

ব্যবসায়ীদের নেতৃবৃন্দ, সিইও, সিএফও এবং সকল স্তরের বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা পালন করতে হবে। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন আপনার নিচের লাইনটি অনেক দূরে। কিন্তু, আমাদের অভিন্ন নিচের লাইনটি আরো গুরুত্বপূর্ণ: প্রকৃতি যদি লাঞ্ছিত হয়, তবে এটি আমাদের রক্ষা করতে পারবে না, তখন আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হব। বাংলাদেশে যা ঘটে তা লন্ডন এবং নিউ ইয়র্কের শেয়ার বাজারকে প্রভাবিত করে।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি থেকে কেউ মুক্ত নয়। একমাত্র সমাধান হচ্ছে, সরকারের নীতি এবং ব্যবসায়িক অনুশীলনের একটি পদ্ধতিগত পরিবর্তন, উচ্চতর থেকে কম কার্বন ও গ্রহের সম্পদ শোষণে যত্নবান হওয়া। কভিড-১৯ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক অর্থনেতিক বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায় যে জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর এর প্রভাব মিশ্রিত হয়েছে। আমি সবুজ পুনরুদ্ধারের অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ইইউ’কে স্যালুট জানাই।

আমরা বাংলাদেশেও এটি করার পরিকল্পনা করছি এবং আমি আশাবাদী আমার সহকর্মী সরকারি নেতাদের পাশাপাশি ব্যবসায়ী নেতারাও এটি করবেন। ভবিষ্যতের কাজগুলো অবশ্যই অগ্রাধিকার দিয়ে আগামী দশকের জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি এবং প্রকৃতিকে ধ্বংস সাধারণ হুমকি। একটি পরিষ্কার, সবুজ এবং নিরাপদ বিশ্ব: একটি সার্বজনীন সমাধানের জন্য কাজ করতে তাদের আমাদের ঐক্যবদ্ধ করা উচিত।

যেমনটি আমরা বাংলায় বলি: ‘ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না’- আমাদের এমন কিছু করা উচিত নয়, যার জন্য পরে আফসোস করতে হয়।

সূত্র: বাসস

Related posts

ঘুরে দাঁড়াচ্ছে কৃষক ॥ আমন থেকে আসবে দেড় কোটি টন চাল

admin

সৌদি প্রবাসীদের সুসংবাদ দিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

admin

গণস্বাস্থ্যের করোনা ল্যাব ও প্লাজমা সেন্টার বন্ধের নির্দেশ

admin

Leave a Comment