সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গা


hadayet প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৩, ২০২৩, ৪:০১ পূর্বাহ্ন /
সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গা

রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। একদিকে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে গড়িমসি করছে। অন্যদিকে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে রোহিঙ্গারা। চলতি মাসেই সাড়ে সাত শর বেশি রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে অন্যত্র যাওয়ার পথে ও জালিয়াতি করে পাসপোর্ট বানাতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক হয়। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডেও জড়িয়ে পড়ছে মিয়ানমারের এই নাগরিকরা। আর টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের জাল পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মনিবন্ধন সনদ তৈরি করে পালাতে সহায়তা করছে কিছু অসাধু বাংলাদেশি।

গত ১৮ জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন আশ্রয়শিবির থেকে পালিয়ে বের হয়ে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমায় যাওয়ার পথে ৭৫৯ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আটক করে পুলিশ। কক্সবাজার শহরের জেল গেট এলাকা থেকে গাড়িবহরটি আটক করা হয়। আটক রোহিঙ্গাদের বড় অংশই আর ক্যাম্পে ফিরত না বলে ধারণা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরদিন ১৯ জানুয়ারি নোয়াখালীর হাতিয়ার ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকা থেকে পালিয়ে এসে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নে স্থানীয়দের হাতে আটক হয় তিন রোহিঙ্গা। একই দিনে জালিয়াতি করে জন্মসনদ বানিয়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে কুড়িগ্রাম পাসপোর্ট অফিসে আটক হয় দুই রোহিঙ্গা তরুণী। মানবিক দিক বিবেচনা করে সাময়িক সময়ের জন্য বাংলাদেশ সরকার প্রায় সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে নির্দিষ্ট এলাকায় আশ্রয় দিলেও তারা এখন জনবহুল দেশটির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্যাম্প থেকে পালিয়ে মিশে যেতে চাইছে দেশের মূল জনস্রোতে। ২০২২ সালেও অসংখ্য রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক হয়। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এনা পরিবহনের বাস থেকে ১৬ রোহিঙ্গা আটক হয়। ১৪ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে আটক হয় ৮ রোহিঙ্গা। ২৪ নভেম্বর কক্সবাজারের উখিয়ার থানা গেট এলাকা থেকে দুটি বাসসহ ৯১ রোহিঙ্গাকে আটক করে পুলিশ। ভাসানচর আশ্রয়ণ প্রকল্প থেকে পালিয়ে আসা সাত রোহিঙ্গাকে দুই দালালসহ নোয়াখালীর সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুর ইউনিয়ন থেকে ৩১ অক্টোবর রাতে আটক করে স্থানীয়রা। ২৪ অক্টোবর কক্সবাজারের ঈদগাঁওয়ের করিম সিকদার ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে জাল জন্মসনদ ও পাসপোর্টসহ এক রোহিঙ্গা আটক হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে পাসপোর্ট করতে গিয়ে মানিকগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ধরা পড়ে দুই রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। স্থানীয় এক দালালের সঙ্গে ১ লাখ টাকার চুক্তিতে পাসপোর্ট করতে যান বলে জানান রোহিঙ্গা তরুণী। ২৩ আগস্ট বিকালে বিমানযোগে ঢাকায় যাওয়ার সময় কক্সবাজার বিমানবন্দরে ১১ রোহিঙ্গা আটক হয়। ২ আগস্ট রাত পৌনে ১টায় ভাসানচর থেকে পালিয়ে আসা নারী-শিশুসহ সাত রোহিঙ্গা নোয়াখালীর সুবর্ণচরে আটক হয়। ২০ জুলাই রাতে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহী ইউনিয়নে একটি খালপাড় থেকে ১৯ রোহিঙ্গাকে আটক করে স্থানীয়রা। ২৩ মে বাংলাদেশের নাগরিক সেজে চট্টগ্রামের মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে গিয়ে আটক হন এক রোহিঙ্গা তরুণী। ৩ ফেব্রুয়ারি মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে পাসপোর্ট করতে গিয়ে আটক হন আরমান নামে এক রোহিঙ্গা যুবক। তার কাছে ভেরিফায়েড জন্মনিবন্ধন সনদ পাওয়া যায়। গত পাঁচ বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় রোহিঙ্গা আটকের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কথাবার্তা ও চলাফেরায় সন্দেহ হওয়ায় আটক হয়েছে এসব রোহিঙ্গা। এ নিয়ে জানতে চাইলে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের পালিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশের জন্যই বিপদ। কিন্তু অনেক বাঙালিই রোহিঙ্গাদের চাকরি দিচ্ছে। রোহিঙ্গাদের নির্ধারিত এলাকার মধ্যে রাখতে তারকাঁটা দিয়ে ঘেরা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অনেক স্থানে তারকাঁটার বেড়া কেটে ফেলেছে। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন কিছু না। চেহারা, রং ও ভাষায় মিল থাকায় তাদের চিহ্নিত করাও সহজ না। নানাভাবে পুলিশের চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে। আমরা চেকপোস্টগুলোতে নজরদারি বাড়ানোর জন্য সবসময় তাগিদ দিচ্ছি। কক্সবাজারে কাজ করা বিভিন্ন এনজিও কর্মকর্তা ও স্থানীয়দের মতে, অনেক রোহিঙ্গা পুরোপুরি শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে পারে। তারা সহজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। গত চার বছরে ক্যাম্প থেকে অসংখ্য রোহিঙ্গা পালিয়ে গেছে। ফের শুমারি করলে সংখ্যাটি পরিষ্কার হবে। ভাষাগত মিল থাকায় পালানো রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কেউ আবার সমুদ্রপথে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে ক্যাম্পে ফেরত এসেছে অনেকে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) হিসাবে, শুধু ২০২২ সালেই সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর ৭ লাখ ৭৩ হাজার ৯৭২ জন রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আসে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে আসে প্রায় ৮৭ হাজার। এর আগে থেকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় আড়াই লাখ রোহিঙ্গা ছিল। তিন বছর আগেই বাংলাদেশে আসা ১১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গার বায়োমেট্রিক ও তথ্য সংগ্রহ করেছে নির্বাচন কমিশন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে প্রতি বছর গড়ে ৩০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু জন্ম গ্রহণ করছে। সেই হিসাবে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার কথা।