অর্ধশতাধিক আসনে ইভিএমে ভোট


hadayet প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৪, ২০২৩, ৩:৪৪ পূর্বাহ্ন /
অর্ধশতাধিক আসনে ইভিএমে ভোট

প্রকল্প অনুমোদন না হওয়ায় আগামী সাধারণ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের ১৫০ আসনের পরিবর্তে অর্ধশতাধিক আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট গ্রহণের চিন্তা করছে নির্বাচন কমিশন। সংসদীয় আসন মোট ৩০০।

রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএমের বিরোধিতা করে আসছে। তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল এর পক্ষে।

রাজনৈতিক আপত্তি আমলে না নিলেও আর্থিক সংকটে শেষ পর্যন্ত আটকে গেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বহুল আলোচিত ইভিএম প্রকল্প। নতুন করে আর ইভিএম কেনা আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। গতকাল সোমবার পরিকল্পনা কমিশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের কথা ইসিকে জানিয়ে দেওয়া হয়।
এর পরপরই ইসি সচিব জাহাংগীর আলম গণমাধ্যমের সামনে এ তথ্য তুলে ধরেন। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব তিনি বলেন, কমিশনের হাতে যে ইভিএম আছে, আগামী নির্বাচনে সেগুলো ব্যবহার করা হবে। তিনি জানান, কমিশন বলেছিল, নতুন মেশিন পেলে সর্বোচ্চ ১৫০ আসনে ইভিএমে ভোট হবে। নতুন ইভিএম না পেলে ২০১৮ সালের ইভিএম দিয়ে যত আসনে সম্ভব, ভোট হবে। সে সিদ্ধান্ত বহাল আছে। কমিশনের হাতে অন্তত দেড় লাখ ইভিএম রয়েছে। তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ব্যবহারযোগ্য ইভিএম দিয়ে ৫০-৭০ আসনেও ভোট হতে পারে।

জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, নতুন ইভিএম মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ, ইভিএম নামক যন্ত্রটি খুবই নিম্নমানের। এটি দিয়ে জালিয়াতি করা যায়। বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার মতো অবস্থা। জনগণ এটি চায় না। তার পরও ৫০-৬০টি আসনে ইভিএম ব্যবহার করার কথা বলছে ইসি। আমরা বলব, এমনিতে নির্বাচন কমিশন আস্থার সংকটে রয়েছে। এ আসনগুলোতে ইভিএম ব্যবহার করলে আস্থা বাড়বে না, বরং আরও কমবে। সংকট আরও ঘনীভূত হবে। বিতর্ক আরও বাড়বে। আমাদের অনুরোধ, আস্থার সংকট দূর করুন। বিতর্ক আর না বাড়িয়ে অবসানের চেষ্টা করুন। এ জন্য কোনো আসনেই ইভিএম ব্যবহার না করতে ইসির প্রতি অনুরোধ করব।

তবে নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবীব খান সমকালকে বলেছেন, তাঁরা দায়িত্ব নেওয়ার পর পাঁচ শতাধিক নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হয়েছে। কোথাও অভিযোগ ওঠেনি। অনেক সময় সাধ ও সাধ্যের মধ্যে সমন্বয় করা সম্ভব হয় না। অর্থনৈতিক কারণেই দেড়শ আসনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত থেকে তাঁদের সরে আসতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, নতুন এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশা পূরণ হলো। বিশিষ্ট নাগরিকদের যে ইচ্ছা ছিল, সেটাও বাস্তবায়িত হলো। এখন আমরা মনে করি, দল-মত নির্বিশেষে বর্তমান সিদ্ধান্ত পছন্দ করবে। আমরা আশা করি, সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেবে এবং সহযোগিতা করবে। ইভিএমের পাশাপাশি ব্যালটেও নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু করা সম্ভব, সেটা প্রমাণ করব ইনশাআল্লাহ।

বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় সব মহল থেকেই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে ইসির ওপর চাপ বাড়তে থাকে। এসব চাপ মোকাবিলায় ইসি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ব্যবহার এবং ব্যালটের পরিবর্তে ইভিএমে ভোট নেওয়ার কথা জানায়। নিকট অতীতে অনুষ্ঠিত একাধিক জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ওঠা নানা অনিয়মের অভিযোগের জবাব দিতে এ দুটি বিষয়কে অনেকটা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে তারা। যদিও ইভিএমে ভোট গ্রহণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল বিতর্ক রয়েছে। ইভিএমের বিরুদ্ধে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে আসছে রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ জোটের অন্যান্য দল। আবার অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে ইভিএম কেনা ও এর পেছনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন ছিল।

কিন্তু গতকাল সরকারের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হয়, আগামী সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই লাখ নতুন ইভিএম কিনতে ইসির ৮ হাজার ৭১১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব আপাতত অনুমোদন পাচ্ছে না। ইসি সচিব জাহাংগীর আলম জানান, নতুন দুই লাখ ইভিএম কিনতে যে প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশন দিয়েছিল, তা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সরকারের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনায় আপাতত প্রক্রিয়াকরণ হচ্ছে না। পরিকল্পনা কমিশন বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়ে ইসিকে জানিয়েছে।

আগামী সংসদ নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে ইসি আয়োজিত সংলাপেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া বড় কোনো দলের অবস্থান ইভিএমের পক্ষে ছিল না। বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এ পদ্ধতি থেকে ইসিকে সরে আসার পরামর্শ দেন। কিন্তু ইভিএম ব্যবহারে ইসি তাদের অবস্থানে এতদিন অনড় মনোভাব দেখিয়ে আসছিল। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ভোটে ইভিএম ব্যবহারের দাবি জানানো হয়।

গতকাল ঢাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, আগামী নির্বাচনে আমরা ৩০০ আসনেই ইভিএম চাই। নির্বাচন কমিশন তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী যে ক’টি আসনে ইভিএম দিতে পারবে, আওয়ামী লীগ তা মেনে নেবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, আমরা কোনো ইভিএমের নির্বাচনে যাব না। এমনকি সরকারের অধীনেই কোনো নির্বাচনে যাব না। সরকারের পদত্যাগের পর নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠিত হবে। সেই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে। তাই ইভিএম নিয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন কী বলল, না বলল- তাতে মাথা ঘামানোর কিছু নেই।

এদিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাজাহান সমকালকে বলেন, ইভিএম হচ্ছে ভোট চুরির মেশিন। যে কারণে একটি আসনেও আমরা ইভিএম চাই না। এর মাধ্যমে আরেক দফা ভোটাধিকার হরণের প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান সমকালকে বলেন, ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচন হলে কারচুপি করা যায় না। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়। তাই আওয়ামী লীগ ইভিএম ব্যবহারের দাবি জানিয়েছিল।

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি পুনর্ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ বলেন, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ইভিএমে দ্রুত ভোট গ্রহণ ও গণনার সুবিধা রয়েছে। তাই তাঁর দল নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের দাবি জানিয়েছিল। তিনি বলেন, বৈশ্বিক মন্দার কারণে বর্তমান সরকার সাশ্রয়ী নীতি গ্রহণ করেছে। যে কারণে ইসি ইভিএম প্রকল্প থেকে হয়তো সরে এসেছে। ইসির দায়িত্ব হচ্ছে, সবার কাছে নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য এবং অবাধ ও সুষ্ঠু করা। সেটা নিশ্চিত হলেই আওয়ামী লীগ খুশি। তাই ইসির যে কোনো সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আওয়ামী লীগ।

ইসির হাতে বর্তমানে দেড় লাখ ইভিএম আছে, যা দিয়ে ৬০ থেকে ৭০টি আসনে ভোট করা সম্ভব। যদিও এর মধ্যে ৩০ ভাগ যন্ত্রাংশ নষ্ট বা হারিয়ে গেছে।

গত বছরের জুলাইয়ে ইসির নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনেই ইভিএমে ভোট চায়। অন্যদিকে বিএনপি ইভিএমকে ‘কারচুপির যন্ত্র’ বলে অভিযোগ করে আসছে। সংলাপে ২২টি দল ইভিএম নিয়ে তাদের মতামত দিয়েছিল। জাতীয় পার্টিসহ ১৪টি দল ইভিএম নিয়ে তাদের সংশয় ও সন্দেহের কথা স্পষ্টভাবেই বলেছে। সিইসি নিজেও সংলাপে বলেছিলেন, অধিকাংশ রাজনৈতিক দল ইভিএমে বিশ্বাস করছে না।

নতুন করে ইভিএম কিনতে ৮ হাজার ৭১১ কোটি ৪৪ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয় গত ১৯ অক্টোবর। প্রকল্পটির নাম ‘নির্বাচনী ব্যবস্থায় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ব্যবহার বৃদ্ধি এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা’। প্রকল্পের পুরো টাকা সরকারেরই জোগান দেওয়ার কথা ছিল।

২০১০ সালের ১৭ জুন এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কমিশন দেশে ভোট ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ইভিএমের সূচনা করে। এর পর থেকে শুরু হয় ইভিএম বিতর্ক।