অষ্টম অ্যাডওয়ার্ডের মতোই নির্বাসনে হ্যারি-মেগান


hadayet প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২২, ৫:১৪ পূর্বাহ্ন / ২১
অষ্টম অ্যাডওয়ার্ডের মতোই নির্বাসনে হ্যারি-মেগান

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের কফিনের পেছনে হেঁটে যাচ্ছেন প্রিন্স উইলিয়াম ও হ্যারি। মাঝখানে রাজা তৃতীয় চার্লস। চোখে-মুখে বিষণ্ণতা। যার যার মতো মাটিতে চোখ রেখে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছেন না। ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ানের মতে, এ দৃশ্য রাজপরিবারের মধ্যে সম্পর্কের যে উষ্ণতা নেই, তা-ই বলে দিচ্ছে।

সাত দশকের রাজত্বের পর ব্রিটেনের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শাসক রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ মারা যান। তিনি ১৯৫২ সালে সিংহাসনে বসেন। জীবদ্দশায় তিনি বিশাল সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে ছিলেন।

রাজপরিবারের সঙ্গে প্রিন্স হ্যারি-মেগানের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে যেতে পারেননি রানি। তার মৃত্যুর পর এ ঘটনা নতুন করে সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। এতে মেগানের উদ্ধত স্বভাবকে যেমন দায়ী করা হচ্ছে, তেমনই নতুন রাজাকে ‘নিষ্ঠুর’ হিসেবেও উল্লেখ করা হচ্ছে।

সন্তানকে নির্বাসনে পাঠাচ্ছেন তৃতীয় চার্লস
সিংহাসনে বসার পর ছেলে প্রিন্স হ্যারি ও পুত্রবধূ মেগান মার্কলেকে দূরে সরিয়ে দিলেন নতুন ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লস। কেবল দূরেই না; তাকে স্থায়ীভাবে নির্বাসনে পাঠানো হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে এমনটিই দাবি করা হচ্ছে। রাজা অষ্টম অ্যাডওয়ার্ডকে সিংহাসনচ্যুত করার দৃষ্টান্তকেই তিনি সামনে নিয়ে আসছেন।

ওয়ালিস সিম্পসন নামের বিয়ে বিচ্ছেদ করা এক নারীর প্রেমে পড়ে তাকে অষ্টম অ্যাডওয়ার্ডকে সিংহাসন ছাড়তে হয়েছিল। কারণ রাজপরিবারের নিয়ম ওই বিয়েকে সমর্থন করেনি। এটি ১৯৩৬ সালের ঘটনা। এরপর থেকে অষ্টম অ্যাডওয়ার্ডকে বাকি জীবন যুক্তরাজ্যের বাইরে কাটাতে হয়েছে। হ্যারি ও মেগানের ক্ষেত্রে সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে। সিম্পসন ও মেগান দুজনেই মার্কিন নাগরিক। সবমিলিয়ে নিজের সন্তানকে নির্বাসনে পাঠাতে যাচ্ছেন রাজা তৃতীয় চার্লস।

সূত্রের বরাতে দ্য ডেইলি বিস্টের খবর বলছে, অ্যাডওয়ার্ডকে নির্বাসনে পাঠিয়ে সিংহাসনের সংকট সামলেছিল তখনকার রাজপরিবার। অর্থাৎ তাকে অবাধ্য, বিপথগামী, গুরুত্বহীন ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ব্রিটেনের বাসিন্দারা তাকে আর মেনে নিতে পারেননি। এরই মধ্যে সেই চক্রে পড়েছেন হ্যারি ও মেগান। তৃতীয় চার্লসের অধীন এ অস্বস্তি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠছে।

রাজতন্ত্রের কাঠামোর জন্য একজন একগুঁয়ে রাজার চেয়ে একগুঁয়ে সন্তান কখনো বড়ো হুমকি হতে পারেন না। এর মধ্যেই জেদি ও বদমেজাজের খেতাব পেয়েছেন রাজা তৃতীয় চার্লস।

এবার তার সিংহাসন আরোহণের প্রক্রিয়ার সঙ্গে হ্যারি-মেগানের নির্বাসন কীভাবে জলজ্যান্ত হয়ে উঠবে, তা জানালেন বাকিংহাম প্রাসাদে কাজ করা আরেকটি সূত্র। রাজপরিবারের সাবেক ওই কর্মী বলেন, রাজ্যাভিষেকে হ্যারি ও মেগান আমন্ত্রণ পাবেন ঠিকই, কিন্তু উঁচুদরের কোনো আসনে তাদের বসতে দেয়া হবে না। বরং প্রিন্সেস বিয়াট্রিস ও ইউজেনিকে নিয়ে সস্তা আসনই বরাদ্দ থাকবে তাদের জন্য। রাজপরিবার কঠোরভাবেই তাদের এড়িয়ে চলবে।

বাকিংহাম প্রাসাদের সাবেক এককর্মী বলেন, সিংহাসনে আরোহণের বিবৃতিতে হ্যারি ও মেগানকে বাইরের দেশেই নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছেন রাজা চার্লস। কোনো রাখঢাক না রেখেই বলা হয়েছে, তারা যাতে বারবার যুক্তরাজ্যে ভ্রমণ করে তার রাজত্বকে বিপর্যস্ত করে না তোলেন।

এর আগে এক খবরে বলা হয়েছে, রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পরেও রাজপরিবারে সহজ ও স্বাভাবিক হতে পারছেন না এ দম্পতি। পরিবারের সঙ্গে তাদের সম্পর্কে অস্বস্তি থেকেই যাচ্ছে।

বিষয়টির আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন রাজপরিবার বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টোফার আন্ডারসন। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি মেগান মার্কলে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তাতে আমরা এ অস্বস্তি টের পেয়েছি। আসলে এটি একটি খারাপ দৃষ্টান্ত হতে যাচ্ছে। আগের ঘটনাগুলো মাথায় রাখলে বিষয়টি বোঝা কঠিন হবে না। সত্যিকার অর্থে পুরো ঘটনাই দুঃখজনক।’

‘দ্য কাট’ নামের একটি সাময়িকীতে দেয়া সাক্ষাৎকারে মেগান বলেন, রাজপরিবারের দায়িত্ব থেকে হ্যারি ও তিনি সরে যাওয়ার পর তাদের ওপর মারাত্মক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

বর্ণবাদের অভিযোগ
দ্য সুইটসকে দেয়া সাক্ষাৎকারে মেগান মার্কলে বলেন, রাজপরিবারের আক্ষরিক অর্থে এমন এক কাঠামো দাঁড়িয়েছে, যাতে কেউ যদি তার সন্তানদের ছবিও প্রকাশ করতে যায়, তাহলে তা প্রথমে রয়েল রোটাকে দিতে হবে।

রয়েল রোটা বলতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের সংবাদ কাভার করা সাংবাদিক সংঘকে বোঝায়। তিনি আরও বলেন, ‘তাহলে যারা আমার সন্তানদের নিগার (কৃষ্ণাঙ্গ) বলে ডেকেছে, তাদের কেন ছবি দেব। বরং তাদের হাতেই ছবি দেব, যারা আমার সন্তানদের ভালোবাসে।’

ওপেরাহ উইনফ্রেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই রাজবধূ বলতে চেয়েছিলেন যে রাজপরিবারের সঙ্গে জীবন টিকিয়ে রাখা প্রায় অসম্ভব। তাদের এই সাক্ষাৎকার এতো বেশি স্পর্শকাতর ছিল যে ওপেরাহ বলেই ফেলেছেন- আপনাদের বক্তব্যে অনেকগুলো বেদনাদায়ক ও স্পর্শকাতর বিষয় উঠে এসেছে।

২০২০ সালে রাজকীয় দায়িত্ব থেকে সরে যান হ্যারি-মেগান দম্পতি। পরে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় পাড়ি জমান। যদিও প্রিন্স ফিলিপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও রানির সিংহাসনে আরোহনের রজতজয়ন্তীর মতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের যোগ দিতে দেখা গেছে। এসব কিছুর মধ্যেও রানির মৃত্যুর পর প্রিন্স উইলিয়াম ও কেট মিডলটনের সঙ্গে প্রকাশ্যে আসেন তারা।

সিংহাসনের নতুন উত্তরসূরি ও প্রিন্সেস অব ওয়েলসের সঙ্গে মিলে তারা রানির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রানির মরদেহে কালো পোশাক পরা এই দম্পতি সস্নেহে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করেন। শোকবার্তায় তারা বলেন, আমরা সবাই রানির কাছে কৃতজ্ঞ। আমাদের সব ভালোবাসা রানির জন্য রেখে দিয়েছি।

অপরিপক্ক উদ্ধত মেগান মার্কলে
হ্যারি ও মেগানকে নিয়ে একটি বই লিখেছেন ভাষ্যকার ডেইজি কাউজিনস। তার অভিযোগ, কুইন কনসোর্ট ক্যামিলাকে তাচ্ছিল্য করেছেন ডাচেস অব সাসেক্স। ক্যামিলা তাকে যতোই সহায়তার প্রস্তাব দিক না কেন; তাতে পাত্তা দিচ্ছেন না মেগান মার্কলে। নিজেকে ছাড়া কাউকে গুরুত্ব দেন না এই রাজবধূ। অত্যন্ত বিষাক্তভাবে পরিবার থেকে প্রিন্স হ্যারিকে বিচ্ছিন্ন করেছেন তিনি। আমার মনে হচ্ছে, চোখের পানিতেই এই অবস্থার অবসান হবে।

ডেইজি কাউজিনস বলেন, কুইন কনসোর্ট যদিও জনপ্রিয় কেউ না। প্রিন্সেস ডায়ানার মর্মান্তিক মৃত্যুর পর দীর্ঘ সময় তাকে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে ঘৃণিত নারী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। যে কারণে তাকে সহজেই অবজ্ঞা করতে পেরেছেন মেগান মার্কলে। কাজেই তিনি খুবই উদ্ধত ও অপরিপক্ক। তার স্বভাব আসলে এমনই।

ব্রিটিশ টেলিভিশন ভাষ্যকার মনে করেন, মেগান মার্কলের উচিত কুইন কনসোর্টের কথা শোনা। তার কাছ থেকে সহায়তা নেয়া। রাজপরিবার নিয়ে লেখালেখি করা ম্যাথিও লজ বলেন, ফ্লাইট মিস করে রানিকে বিদায় জানানোর সুযোগ হারান প্রিন্স হ্যারি। এতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। আর মেগান মার্কলের কারণেই এমনটি ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, মেগানকে তার সঙ্গে আসতে সায় দেয়ার জন্য হ্যারি যখন তার বাবাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলেন, তখন ভাই উইলিয়াম, চাচা প্রিন্স অ্যান্ড্রু ও অ্যাডওয়ার্ডকে বহন করে নিয়ে যাওয়া ফ্লাইট ধরতে পারেননি তিনি। কিন্তু এটি ছিল রানিকে তার বিদায় জানানোর সুযোগ। এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

দ্য সানের খবরেও দাবি করা হয়, মেগানকে বালমোরালে নিয়ে আসতে হ্যারি এত বেশি ব্যস্ত ছিলেন যে, তিনি তার পরিবারকে বহন করে নিয়ে আসা ফ্লাইটটিতে উঠতে পারেননি। রানির মৃত্যুর পর বালমোরাল প্রাসাদে হ্যারিকে একসঙ্গে নৈশভোজে অংশে নিতে বলেন রাজা। কিন্তু বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে খেতে বসতে অস্বীকার করেন তিনি। তার ক্ষোভ, প্রাসাদে মেগানকে তার সঙ্গে যোগ দিতে বারণ করেন রাজা।

এরপর তিনি প্রাসাদের বাইরে চলে যান। রাজার প্রতি এটি ছিল মারাত্মক অবজ্ঞা। কাজেই লন্ডনে ফিরে যেতে প্রথম ফ্লাইটটি যখন তার ধরার কথা, তখন তিনি বালমোরালে ছিলেন না। এতে পরিবারের সঙ্গে তার মন কষাকষি আরও চড়া হয়ে যায়।

সামাজিকমাধ্যমে সমালোচনার ঝড়
রানির মৃত্যুতেও সামাজিকমাধ্যমে প্রিন্স হ্যারি ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় থামেনি। দ্বিতীয় এলিজাবেথকে সমাহিত করার পাঁচদিন পরও এই দম্পতির ওপর ব্রিটিশদের ক্ষোভ কোনো অংশে কমেনি। রেডিও এলবিসির জেমস ও’ব্রিয়ান বলেন,  নৃশংস ও গর্হিত অপরাধীরাও রাজার পুত্রবধূর চেয়ে কম সমালোচনার শিকার হয়েছেন। ব্রিটেনের ভয়ঙ্কর অপরাধীদেরও এতো ভর্ৎসনা করা হয় না, যা হ্যারি-মেগানকে সইতে হয়েছে।

দেশটির সেন্টার ফর কাউন্টিং ডিজিটাল হেইটের জরিপ বলছে, দ্বিতীয় এলিজাবেথের মৃত্যুর পর সামাজিকমাধ্যমে শয়তানি ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। এমন দাবিও উঠেছিল যে মেগানের কাছে গোপন মাইক্রোফোন ছিল।

সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আহমেদ বলেন, আমাদের গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে সব বিখ্যাত নারীরাই সামাজিকমাধ্যমে হয়রানি ও উত্ত্যক্তর শিকার হন। এই সমস্যার সমাধানে সামাজকমাধ্যমগুলো ব্যর্থ হয়েছে। মেগান মার্কলের প্রতি বর্ণবাদী ও নারীবিদ্বেষী আচরণ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।

তিনি মনে করেন, উত্ত্যক্তকারী ও বিদ্বেষপোষণকারীদের জন্য সামাজিকমাধ্যম খুবই নিরাপদ জায়গা। এখানে নারীরা নিরাপদ না। এ অবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।

মিটছে না পারিবারিক দ্বন্দ্ব
হ্যারি, উইলিয়াম ও রাজা তৃতীয় চার্লসকে নিয়ে আলোচনায় পরিবারিক দ্বন্দ্বই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। সিবিএস নিউজের সঞ্চালক গেইলি কিং বলেন, পরিবারের মধ্যে কোনো মিলমিশ না করেই লস অ্যাঞ্জেলেসে ফিরে গেছেন হ্যারি ও মেগান। যদিও তার এই দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, বড় পরিবারগুলোতে সবসময় বিভিন্ন নাটকীয় ঘটনা থাকে। থাকে অশান্তি ও অস্থিরতা। ব্রিটিশ রাজপরিবারও ব্যতিক্রম কিছু না।

পরিবারের সঙ্গে প্রিন্স হ্যারি সম্পর্ক মেরামত করবেন—জীবিত থাকতে এমন আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। রাজকীয় লেখক রবার্ট হার্ডম্যান বলেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত হ্যারিকে স্নেহ করতেন রানি। হ্যারিও রানিকে শ্রদ্ধা করতেন। উইন্ডসর ও ক্যালিফোর্নিয়ার মধ্যকার যোগাযোগের মাধ্যম ছিলেন তিনি। তার চাওয়া ছিল, পারিবারিক দ্বন্দ্ব মিটে যাক। যদিও জীবিত থাকতে তিনি তা দেখে যেতে পারেননি।

তবে সিংহাসন রক্ষায় রাজা আরও নিষ্ঠুর হবেন বলেই ধারণা করা হয়েছে। তিনি চাচ্ছেন না রাজপরিবার আরও কোনো বিতর্কে জড়িয়ে পড়ুক। যে কারণে প্রিন্স হ্যারিকে রাজতন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে সরিয়ে রাখবেন। তারা যাতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের কাছে ঘেঁষতে না-পারে; তা নিশ্চিত করতে ছেলে ও তার বউকে নির্বাসনে পাঠাবেন তিনি।