ড. ইউনূসের অভিশপ্ত জীবন নাকি পাপের ফল?


hadayet প্রকাশের সময় : জুন ৯, ২০২৪, ৪:১৭ পূর্বাহ্ন /
ড. ইউনূসের অভিশপ্ত জীবন নাকি পাপের ফল?

নিজস্ব প্রতিবেদক

নোবেল জয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণসহ অভিযোগ করেছে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ইউনূসের বিরুদ্ধে গত বছরের ৩০ মে মামলা করেছে দুদক। তাছাড়া শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসসহ গ্রামীণ টেলিকমের চার শীর্ষ কর্মকর্তার ছয় মাসের সাজাও হয়েছে।

অর্থ আত্মসাৎ ও পাচার মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানির পর আদালত প্রাঙ্গণে রবিবার (২ জুন) সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ড. ইউনুস বলেছেন, ‘লোহার খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি আদালতের কাঠগড়ায়। এ হল অভিশপ্ত জীবনের একটা অংশ।’

অন্যদিকে গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান আইন উপদেষ্টা মাসুদ আখতার বলেছেন, ‘কোনো দেব-দেবীর অভিশাপ নয়, বরং গ্রামীণ ব্যাংকের এক কোটি ৫ লাখ সদস্যের সঙ্গে প্রতারণার করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই পাপের ফলাফল তিনি ভোগ করছেন।’

দুদকের উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান বাদী হয়ে ২০২৩ সালের ৩০ মে ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ইউনূস ছাড়া এই মামলার অপর আসামিরা হলেন– গ্রামীণ টেলিকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাজমুল ইসলাম, পরিচালক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আশরাফুল হাসান, পরিচালক পারভীন মাহমুদ, নাজনীন সুলতানা, মো. শাহজাহান, নূরজাহান বেগম, এস এম হাজ্জাতুল ইসলাম লতিফী, অ্যাডভোকেট মো. ইউসুফ আলী, অ্যাডভোকেট জাফরুল হাসান শরীফ, গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি মো. কামরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ মাহমুদ হাসান, প্রতিনিধি মো. মাইনুল ইসলাম এবং গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়নের দপ্তর সম্পাদক কামরুল হাসান।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আসামিরা ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। অবৈধভাবে অর্থ স্থানান্তর করা হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে অপরাধ।

মামলার এজাহারে বলা হয়, ড. ইউনূস ও নাজমুল ইসলামসহ গ্রামীণ টেলিকম বোর্ড সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০২২ সালের ৯ মে অনুষ্ঠিত ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় হিসাব খোলা হয়। তবে ব্যাংকে হিসাব খোলা হয় এক দিন আগেই। গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের পাওনা লভ্যাংশ বিতরণের জন্য গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন এবং গ্রামীণ টেলিকমের সঙ্গে সেটেলমেন্ট চুক্তি হয় ওই বছরের ২৭ এপ্রিল।

এজাহারে বলা হয়, সেটেলমেন্ট চুক্তিতেও ৮ মে ব্যাংক হিসাব দেখানো আছে, যা বাস্তবে অসম্ভব। ‘ভুয়া’ সেটেলমেন্ট চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ও ১০৮তম বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক গ্রামীণ টেলিকমের ৪৩৭ কোটি ১ লাখ ১২ হাজার ৬২১ টাকা ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর শাখা থেকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করা হয় ২০২২ সালের ১০ মে। পরে ২২ জুন অনুষ্ঠিত ১০৯তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অ্যাডভোকেট ফি হিসাবে অতিরিক্ত ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯১ হাজার ৩৮৯ টাকা প্রদানের বিষয়টি অনুমোদন দেওয়া হয়।

অন্যদিকে ঢাকা ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাব থেকে গ্রামীণ টেলিকম শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন নামীয় ডাচ বাংলা ব্যাংকের লোকাল অফিসের হিসাব থেকে তিন দফায় মোট ২৬ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু কর্মচারীদের লভ্যাংশ বিতরণের পূর্বেই তাদের প্রাপ্য অর্থ তাদের না জানিয়েই ‘অসৎ উদ্দেশ্যে’ ২০২২ সালের মে ও জুন মাসের বিভিন্ন সময়ে সিবিএ নেতা মো. কামরুজ্জামান, মাইনুল ইসলাম ও ফিরোজ মাহমুদ হাসানের ডাচ বাংলা ব্যাংকের মিরপুর শাখার হিসাবে ৩ কোটি টাকা করে স্থানান্তর করা হয়।

একইভাবে আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর কমার্শিয়াল ব্যাংক অফ সিলনের ধানমন্ডি শাখার হিসাবে ৪ কোটি টাকা ও দি সিটি ব্যাংকের গুলশান শাখার হিসাবে ৫ কোটি টাকা এবং আইনজীবী জাফরুল হাসান শরীফ ও আইনজীবী মো. ইউসুফ আলীর স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের গুলশান নর্থ শাখায় যৌথ হিসাবে ৬ কোটি স্থানান্তর করা হয়, যা তাদের প্রাপ্য ছিল না।

দুদকের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী, অ্যাডভোকেট ফি হিসেবে প্রকৃতপক্ষে হস্তান্তরিত হয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকা। বাকি ২৫ কোটি ২২ লাখ ৬ হাজার ৭৮০ টাকা গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বোর্ড সদস্যদের সহায়তায় গ্রামীণ টেলিকমের সিবিএ নেতা এবং আইনজীবীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সেটেলমেন্ট চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে অসৎ উদ্দেশে জালিয়াতির আশ্রয়ে গ্রামীণ টেলিকম থেকে উক্ত অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

এটি দণ্ডবিধি ও মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় ‘শাস্তিযোগ্য অপরাধ’ উল্লেখ করে এজাহারে বলা হয়, “যে কারণে আসামি ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এর ৪(২)(৩) ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।”

এর আগে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক আরিফুজ্জামান বাদী হয়ে মুহাম্মদ ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে অপর একটি মামলা করেন। মামলায় শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা, গণছুটি নগদায়ন না করার অভিযোগ আনা হয়।

শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের করা মামলায় গ্রামীণ টেলিকমের চেয়ারম্যান ড. ইউনূসসহ চারজনকে ছয় মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং প্রত্যেককে ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দিয়ে গত ১ জানুয়ারি রায় দেয় ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত। সাজাপ্রাপ্ত অপর তিনজন হলেন- গ্রামীণ টেলিকমের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফুল হাসান, পরিচালক নুর জাহান বেগম ও মো. শাহজাহান।

অন্যদিকে গ্রামীণ ব্যাংক ড. ইউনুসের বিরুদ্ধে পাঁচটি অভিযোগ জানিয়েছে দুদকে। অভিযোগে বলা হয়, ড. ইউনূস ও তার পরিবারের মালিকানাধীন প্যাকেজেস করপোরেশন লিমিটেডকে নিয়মকানুন না মেনে ৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা ঋণ দেয়া হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়, ইউনূস ও তার পরিবার ব্যাংকের কোটি কোটি টাকার প্রিন্টিং সামগ্রী চড়া দামে ছাপানোর জন্য পারিবারিক কোম্পানিকে কার্যাদেশ দিয়ে বিপুল আর্থিক সুবিধা নেন।

তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩ অনুযায়ী ব্যাংকের ঋণ সুবিধা ভূমিহীন দরিদ্র ঋণগ্রহীতাদের জন্য সীমাবদ্ধ। কিন্তু ড. ইউনূস আইন ভেঙে পারিবারিক প্রতিষ্ঠান প্যাকেজেস করপোরেশনকে ঋণ দেন।

চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়, প্যাকেজেস করপোরেশন ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে ড. ইউনূস ব্যাংকের কাছ থেকে তা মওকুফ করান।

পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়, পরিচালনা পর্ষদকে না জানিয়ে চুক্তি করা হয় এবং ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীকে প্যাকেজেস করপোরেশনে নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া গ্রামীণ ব্যাংকের অফিস বিনামূল্যে ব্যবহার করা হয়।

গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক-কর্মচারীদের লভ্যাংশের ২৫ কোটি ২২ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন হবে কি না তা জানা যাবে ১২ জুন। রবিবার এ মামলায় ১৪ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে সাড়ে ৩ ঘণ্টা ধরে শুনানি হয় ঢাকার চার নম্বর বিশেষ জজ সৈয়দ আরাফাতের আদালতে। শুনানি শেষে আগামী ১২ জুন আদেশের জন্য তারিখ রেখেছেন বিচারক। এই মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে আসেন ড. ইউনুস।

মামলায় অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে আদালত থেকে বের হয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাংবাদিকদের বলেন, ‘মহাকাব্যে দেব-দেবীরা অভিশাপ দেয়। আমিও মনে হয় এ রকম মহাকাব্যের অংশ হয়ে গেছি। কোনো দেব-দেবী আমাকে অভিশাপ দিয়েছে। আমার ওপর অসন্তুষ্ট হয়েছে। অভিশাপের কারণেই আমরা দুদকের এখানে এসেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রথম লোহার খাঁচায় কাঠগড়াতে দাঁড়াতে হল। এটা একটা দেখার মত দৃশ্য। এটা আমার জীবনের একটা স্মরণীয় ঘটনা যে লোহার খাঁচার ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি আদালতের কাঠগড়ায়। এ হল অভিশপ্ত জীবনের একটা অংশ।’

এদিকে সোমবার (৩ জুন) সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান আইন উপদেষ্টা মাসুদ আখতার সাংবাদিকদের বলেন, ‘গ্রামীণ ব্যাংকের এক কোটি ৫ লাখ সদস্যের সঙ্গে প্রতারণার অভিশাপ ভোগ করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস । গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন। সেই পাপের ফলাফল তিনি ভোগ করছেন।’

তিনি বলেন, ‘কোনো দেব-দেবীর অভিশাপ নয়, বরং গ্রামীণ ব্যাংকের এক কোটি ৫ লাখ সদস্যের সঙ্গে প্রতারণার অভিশাপ ভোগ করছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।’

তিনি আরও বলেন, ‘উনি নিজের ও পারিবারিক কোনো সুবিধা নেননি। কিন্তু, উনি প্রিন্টিং প্রেসের জন্য ওনার প্রতিষ্ঠানকে শতকোটি টাকার ওয়ার্ক অর্ডার দিয়েছেন এবং তা ৩০-৪০ শতাংশ বেশি দরে দিয়েছেন । ওনার এক জিএম এসবের প্রতিবাদ করেছেন, তাকে উনি নির্যাতন করেছেন, গৃহবন্দি করেছেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ১৯৯৭ সাল থেকে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০১১ সালে ব্যাংক ছাড়লেও, পরবর্তীতে তিনি তার দুর্নীতি ফাঁস করতে দেননি। কারণ এরপর তার লোকজনই গ্রামীণ ব্যাংক চালিয়েছেন। তবে ২০২০ সালে এক অডিটে ভয়াবহ দুর্নীতির কথা উঠে আসে। আমাদের হাতে এগুলো আসে ২০২৩ সালে।’

মাসুদ আখতার বলেন, ‘ব্যক্তি ইউনূসের সঙ্গে আমাদের কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশ নেই। তার কর্মকাণ্ড, অপকর্মের, পারিবারিক সুবিধা দিয়েছেন তা নিয়ে আমাদের অভিযোগ। ড. ইউনূস অর্থলোভী। আমাদের কোনো কিছু বানোয়াট নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে তিনি প্রতারণা করেছেন। সেই পাপের ফল তিনি ভোগ করছেন।’