আগ্রহের কেন্দ্রে তারেক রহমান, ► কন্যাসহ হলেন ভোটার, নির্বাচন করবেন দুই আসনে ► মাকে দেখতে হাসপাতালে, হাদি, ভাই ও শ্বশুরের কবর জিয়ারত


hadayet প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫, ৩:১৫ পূর্বাহ্ন / ১৮
আগ্রহের কেন্দ্রে তারেক রহমান, ► কন্যাসহ হলেন ভোটার, নির্বাচন করবেন দুই আসনে ► মাকে দেখতে হাসপাতালে, হাদি, ভাই ও শ্বশুরের কবর জিয়ারত

সারা দেশের আগ্রহের কেন্দ্রে এখন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক রহমান। দেশজুড়ে আলোচনায় তিনি। ১৭ বছরের নির্বাসনের অবসান ঘটিয়ে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছেন। দেশে ফিরেই জনজোয়ারে সংবর্ধিত হয়েছেন। এরই মধ্যে গতকাল ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেছেন। সম্পন্ন করেছেন ভোটার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা। রাতে তাঁর মা খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে যান হাসপাতালে। দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নাম সামনে রেখে দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় গেলেও দেশে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে তাঁর ফেরা অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে-এমনটা মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে কিংবা বিদেশে যেখানেই থাকুন, কমপক্ষে ২৫ বছর ধরে রাজনীতি ও আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই রাজনীতিকের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানান সংশয় ছিল। ফেরার পর গণসংবর্ধনা থেকে শুরু করে গতকাল পর্যন্ত তাঁর নিরাপত্তাসহ নানান বিষয় সামনের নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। তাঁরা বলছেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন শুধু ব্যক্তিগত একটি ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের বাঁক পরিবর্তন। এতে শুধু যে দলে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে তা-ই নয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যে শঙ্কার ছায়া ছিল তা-ও কেটে গেছে। নির্বাচন সামনে রেখে জোটের যে রাজনীতি, তাতে নতুন সমীকরণ দেখা যাচ্ছে। এর বাইরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে। ১৯৯১ সালের আগে থেকে বিএনপিপ্রধান বেগম খালেদা জিয়া ও কার্যক্রমনিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতি আবর্তিত হয়। খালেদা জিয়া মারাত্মক অসুস্থ, হাসপাতালে শয্যাশায়ী। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানে পট পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। রাজনীতিতে পরবর্তী প্রজন্মের উত্থানের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের সশরীরে রাজনীতির হাল ধরায় নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দিতে পারে। রাজনীতি বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ্ বলেন, ‘সব মিলিয়ে তাঁর (তারেক রহমান) দেশে আসাটা রাজনৈতিক জীবনের জন্য নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতি এমন বিষয়, শুধু ভার্চুয়ালি মুখের কথা শোনা গেলে ঘনিষ্ঠ রাজনীতির সৃষ্টি হয় না। এই ঘনিষ্ঠ রাজনীতি সৃষ্টি করতে হলে জনগণের কাছে দৈহিক উপস্থিতি দরকার। সেদিক থেকে এখন ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়বে।’ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগবিহীন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য একটি ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ। গত এক বছর মাঠপর্যায়ে বিএনপি সক্রিয় থাকলেও শীর্ষ নেতৃত্বের সশরীরে অনুপস্থিতি দলটির জন্য বড় দুর্বলতা ছিল। তাঁর ফেরার ঘোষণা এমন এক সময়ে এলো, যখন তাঁদেরই সাবেক মিত্র জামায়াতে ইসলামী রাজনীতির মাঠে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ দেওয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াত নিজেদের বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকদের মতে তারেক রহমানের ফেরা জামায়াতের হিসাব পাল্টে দেবে। সংবর্ধনায় জনস্রোত দেখে ইতোমধ্যে জামায়াতসহ অনেক দলের হিসাব পাল্টে গেছে। তাঁর উপস্থিতি বিএনপির তৃণমূল কর্মীদের মনোবল বাড়িয়ে জামায়াতের একক মাথা চাড়া দেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তারেক রহমানের দেশে ফেরা জামায়াতের শক্তি প্রদর্শনের কৌশল চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ আবেগপ্রবণ। তারা যেমন দ্রুত আবেগ প্রকাশ করে, আবার আবেগ চলেও যায়। তাই তারেক রহমানকে এখন কাজ করে দেখাতে হবে।’ বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘তারেক রহমান যেদিন দেশে ফিরেছেন সেদিন বিএনপির নির্বাচনের কাজ অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে।’ দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তারেক রহমানের দেশে ফেরায় ভোটের মাঠের হিসাব পাল্টে গেছে। ভোটে বিএনপির গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে।’

হাদির কবর জিয়ারত : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারত করেছেন। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদসংলগ্ন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমান গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসা থেকে বেরিয়ে ১১টা ২০ মিনিটে সেখানে পৌঁছান। গাড়ি থেকে নেমে শহীদ হাদির কবরে প্রথমে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিনি। পরে ওসমান হাদির কবর ও কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে সুরা ফাতিহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান, প্রো-ভিসি মামুন আহমেদ, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক ড. ওবায়েদুল ইসলাম, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, ছাত্রদল সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব (পিএস) মিয়া নূর উদ্দিন অপু, বিশেষ সহকারী আতিকুর রহমান রুমনসহ নেতা-কর্মীরা।

ভোটার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারলেন : ভোটার তালিকাভুক্ত হতে আনুষ্ঠানিকতা সেরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বেলা ১টায় আগারগাঁওয়ে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) ভবনে উপস্থিত হয়ে আঙুলের ছাপ, আইরিশের প্রতিচ্ছবি আর বায়োমেট্রিক তথ্য দিয়েছেন তিনি। এ সময় ইসি সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ওই ভবনে প্রবেশ করেন তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এরপর আঙুলের ছাপ, আইরিশের প্রতিচ্ছবি আর বায়োমেট্রিক দিয়ে ভোটার হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সারেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। এর আগে এনআইডি উইংয়ের ডিজি এ এস এম হুমায়ুন কবীর জানিয়েছেন, তারেক রহমানের এনআইডি পেতে সর্বোচ্চ এক দিন লাগবে।

ছোট ভাই ও শ্বশুরের কবর জিয়ারত : ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বেলা ২টার দিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে যান তিনি। কোকোর কবরের পাশে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর সুরা ফাতিহা ও দরুদ পাঠ করে ভাইয়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন। ২০১৫ সালের ২৫ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। ওই সময় লন্ডনে নির্বাসিত ছিলেন তারেক রহমান। কোকোর কবর জিয়ারত শেষে তারেক রহমান বনানীর সামরিক কবরস্থানে যান। সেখানে তাঁর শ্বশুর নৌবাহিনীর সাবেক প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খানের কবর জিয়ারত করেন। সুরা ফাতিহা পাঠ করে তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করেন।

পিলখানায় শহীদ সেনা কর্মকর্তাদের কবর জিয়ারত : পিলখানা ট্র্যাজেডিতে শহীদ ৫৭ সেনা কর্মকর্তার কবর জিয়ারত করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজধানীর বনানীতে সামরিক কবরস্থানে উপস্থিত হয়ে তিনি কবর জিয়ারত করেন। এ সময় তারেক রহমানের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। আরও উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন, চেয়ারপারসন কার্যালয়ের বিশেষ কর্মকর্তা মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন মৃধা ও অ্যাডভোকেট মেহেদুল ইসলাম মেহেদী এবং জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের (জেডআরএফ) পরিচালক ডা. শাহ্ মুহাম্মদ আমান উল্লাহ।

১৭ বছর পর মাহবুব ভবনে : দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাজধানীর ধানমন্ডিতে শ্বশুরবাড়ি ‘মাহবুব ভবন’-এ গিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গতকাল বিকালে গুলশানের বাসভবন থেকে সড়কপথে তিনি সেখানে পৌঁছান। মাকে দেখতে হাসপাতালে : চিকিৎসাধীন মা বেগম খালেদা জিয়াকে আবারও দেখতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে যান তারেক রহমান। গতকাল রাত ৯টা ৪০ মিনিটে তিনি হাসপাতালে পৌঁছান।

তারেক রহমান দুটি আসনে নির্বাচন করছেন : তারেক রহমান বগুড়া-৬ সংসদীয় আসনের পাশাপাশি ঢাকা-১৭ আসন থেকেও নির্বাচন করতে যাচ্ছেন। এই আসন ছেড়ে ভোলা থেকে নির্বাচন করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থ। ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে যে তিনটি আসন বিএনপি ফাঁকা রেখেছে, তার মধ্যে গুলশান-বনানী, বারিধারার মতো অভিজাত এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৭ আসনও রয়েছে। এ আসনে বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমানের নির্বাচন করার কথা শোনা যাচ্ছিল। বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দেশে ফেরার পর গতকাল ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার হওয়ার আবেদন করেছেন তারেক রহমান। এর মধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা তাঁকে ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচন করার জন্য অনুরোধ করেছেন। বিষয়টি জানার পর তারেক রহমানকে সম্মান জানিয়ে ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আন্দালিভ রহমান। বিএনপির পক্ষ থেকে আন্দালিভ রহমানকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। সূত্রটি বলছে, আন্দালিভ রহমান এ প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি নিজ দলের প্রতীকে ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচন করার কথা বলেছেন। এ আসনে (ভোলা-১) ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। এর আগে এ আসনে বিএনপি গোলাম নবী আলমগীরকে প্রাথমিকভাবে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছিল। এখন এ আসনে বিএনপি আন্দালিভের বিপরীতে কোনো প্রার্থী রাখবে না বলে জানা গেছে।

ভোলা-১ আসন থেকে ২০০৮ সালে বিএনপির সমর্থনে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। তাঁর বাবা সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত নাজিউর রহমান মঞ্জু এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন।