
সীমান্তে পুশইন বন্ধে ভারত সরকারকে ১৩টি চিঠি দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবু পুশইন বন্ধ করছে না ভারত। গতকালও বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করেছে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। এসব অপচেষ্টা ঠেকাতে সীমান্তে বাড়তি সতর্কতায় রয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এদিকে পুশইন, সীমান্ত হত্যা বন্ধসহ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করতে আজ নয়াদিল্লিতে মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকে বসছে বিজিবি ও বিএসএফ। অন্যদিকে অবৈধ নাগরিকদের ফেরাতে ভারতকে অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রতিমন্ত্রী বলেন, ভারতের পুশইনের চেষ্টা বিজিবি শক্তভাবে প্রতিহত করছে। নিয়ম না মেনে পুশইনের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। পুশইন বন্ধে এখন পর্যন্ত ভারতকে অন্তত ১৩টি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইলিগ্যাল (অবৈধ) যারা আছে তাদের ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া আছে। সেটা মেনেই ভারতকে কাজ করতে হবে। পুশইন দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে প্রভাব ফেলবে। বিজিবি জানিয়েছে, বিএসএফ কর্তৃক শিশু, নারীসহ বিভিন্ন ব্যক্তিকে ঠেলে পাঠানো ঠেকাতে সম্প্রতি বাংলাদেশের ২৬ জেলার সীমান্তে বিপুলসংখ্যক বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। চার পালায় ২৪ ঘণ্টা তাঁরা সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন। সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় স্থানীয় লোকজনও তাঁদের সহযোগিতা করছেন। এদিকে আজ নয়াদিল্লিতে বিএসএফ সদর দপ্তরে বিজিবি ও বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক শুরু হচ্ছে। বিজিবি প্রতিনিধিদল গতকাল নয়াদিল্লি পৌঁছেছে। বৈঠকে নেতৃত্ব দেবেন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী এবং বিএসএফ মহাপরিচালক প্রভীন কুমার। পুশইন, সীমান্তহত্যা, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। দিল্লির কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর শত শত বাংলাদেশিকে আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছে। বৈঠকে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে আট সীমান্তবর্তী জেলার ১৩ আটককেন্দ্রে প্রায় ৪০০ নথিবিহীন অভিবাসী আটকে রাখা হয়েছে।
বিজিবির বাধায় পিছু হটল বিএসএফ : লালমনিরহাট সীমান্তে বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং সীমান্তবাসীর বাধায় পুশইন চেষ্টায় পিছু হটেছে বিএসএফ (ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী)। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে পুশইনের শিকার নারী-শিশুদের শূন্যরেখা থেকে ভারতের অভ্যন্তরে সরিয়ে নিয়েছে দেশটির বাহিনী। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর- লালমনিরহাট : আদিতমারীর দুর্গাপুর ও পাটগ্রামের কুচলিবাড়ি সীমান্তে গভীর রাতে কাঁটাতারের বেড়ার লাইট বন্ধ করে ৭০ থেকে ৮০ জন ভারতীয়কে কয়েক দফা পুশইনের চেষ্টা করা হয়। বিজিবি ও সীমান্তের গ্রামবাসীর প্রতিরোধে পিছু হটে বিএসএফ। রবিবার দিবাগত রাতে এ ঘটনা ঘটে। বর্তমানে গ্রামবাসী এবং বিজিবি টহল জোরদার করেছে। লালমনিরহাট ১৫ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মেহেদী ইমাম বলেন, গভীর রাতে জেলার কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্টে পুশইনের জন্য ভারতীয়দের নিয়ে আসে বিএসএফ। কিন্তু বিজিবি ও জনতার বাধার মুখে তারা চলে যেতে বাধ্য হয়। বিএসএফের যে কোনো অপতৎপরতা রুখে দিতে আমরা প্রস্তুত। ঠাকুরগাঁও : হরিপুর উপজেলার মশালগাঁও সীমান্তে প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পর শূন্যরেখায় অবস্থান করা অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুসহ ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে সরিয়ে নিয়েছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ। গতকাল সকাল ৮টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দিনাজপুর ব্যাটালিয়নের (৪২ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আব্দুল্লাহ আল মঈন হাসান। বিজিবি জানায়, রবিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টার পর বিএসএফ শূন্যরেখায় অবস্থানরত তিনজন পুরুষ, চারজন নারী ও চারজন শিশুসহ ১১ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায়। এর আগে বৃহস্পতিবার দিবাগত গভীর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টার পর ওই ১১ জন মশালগাঁও সীমান্তের শূন্যরেখায় কয়েকদিন ধরে মানবেতর জীবনযাপন করছিলেন।
পঞ্চগড় : পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্তের শূন্যরেখায় তিন দিন আটকে থাকার পর পুশইনের শিকার ১০ জনকে সরিয়ে নিয়েছে বিএসএফ। রবিবার দিবাগত গভীর রাত আড়াইটার দিকে সীমান্তের লাইট বন্ধ করে তাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। এ সময় বিজিবি ও স্থানীয়রা কড়া পাহারায় ছিলেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন নীলফামারী ৫৬ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সিরাজুল ইসলাম। সীমান্ত গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য সোহাগ জানান, রাত ৮টা থেকেই একটু পর পর ভারতীয় সীমান্তের লাইট অফ অন করা হচ্ছিল। রাত ১২টার দিকে আটকে থাকা ১০ জনকে ভারতের অভ্যন্তরে নিয়ে যায় বিএসএফ। পরে আবার তাদের আগের স্থানে নিয়ে আসে। এরপর রাত আড়াইটার দিকে তাদের আবার নিয়ে যায় বিএসএফ। কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানান- শনিবার রাত প্রায় ১০টার দিকে জামালপুর ব্যাটালিয়ন (৩৫ বিজিবি) অধীন রৌমারী সীমান্তের ঝাউবাড়ী ও খেয়ারচর বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় বিএসএফের তৎপরতা লক্ষ করা যায়। মেইন পিলার ১০৬৮ থেকে ১০৭১ নম্বর পিলার পর্যন্ত ভারতের ১৮৩ বিএসএফ সদরটিলা ক্যাম্পের সদস্যরা কয়েকজন বাংলা ভাষাভাষী ভারতীয় নাগরিককে সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে আসে বলে খবর পাওয়া যায়। এ ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় বিজিবি সদস্যরা টহল ও নজরদারি বাড়ান। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিজিবির সঙ্গে সতর্ক অবস্থান নেন।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. নজরুল ইসলাম জানান, শনিবার ও রবিবার রাতে বিএসএফ সদস্যরা সীমান্ত এলাকার লাইট বন্ধ করে কিছু মানুষকে বাংলাদেশের ভিতরে ঢুকানোর চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবি ও এলাকাবাসীর যৌথ প্রতিরোধের মুখে তারা সফল হতে পারেনি। রৌমারীর খেয়ারচর বিজিবি ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার বশির আহমেদ বলেন, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। দিনাজপুর : সম্ভাব্য পুশইন চেষ্টা ঠেকাতে ফুলবাড়ী সীমান্তে কঠোর নজরদারি জোরদার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। ফুলবাড়ী ২৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মোহাম্মদ আরিফ-উজ-জামান বলেন, সীমান্তে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কোনো ভারতীয় নাগরিক যেন অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :