বিবিসির বিশ্লেষণ, যেসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল রিপাবলিকানরা


hadayet প্রকাশের সময় : নভেম্বর ৫, ২০২৬, ৪:৩০ পূর্বাহ্ন / ০
বিবিসির বিশ্লেষণ, যেসব কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেল রিপাবলিকানরা

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর ফলে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল কিছু আসন হারায়। তবে এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়কে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই বছরের শাসনামলের প্রতি ভোটারদের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ইরান যুদ্ধ, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা এবং ডেমোক্র্যাটদের কৌশলী নির্বাচনী প্রচারণাসহ বেশ কয়েকটি বিষয় রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে কাজ করেছে। পাশাপাশি হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন হারানোও দলটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিবিসির এক বিশ্লেষণে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পাঁচটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভ
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি এবারের নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় ছিল। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষের চিত্র উঠে আসে। নর্থ ক্যারোলাইনার এক ভোটার বিবিসিকে জানিয়েছেন, জ্বালানি থেকে শুরু করে মুদি পণ্য—সবকিছুর দাম বেড়েছে। এ কারণে তিনি রিপাবলিকানদের পরিবর্তে ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশে। একই সময়ে দেশটিতে ডিজেলের দামও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছায়।

নির্বাচনী জরিপেও মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে। প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোটার জানিয়েছেন, গত এক বছরে মূল্যস্ফীতির কারণে তাঁরা কিংবা তাঁদের পরিবার মাঝারি থেকে গুরুতর আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি এ পরিস্থিতির জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিকে দায়ী করেছেন। ফলে অর্থনৈতিক চাপ সামাল দিতে না পারার ক্ষোভ ভোটের মাঠে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে গেছে।

ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিনিদের অসন্তোষ
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে ইরান যুদ্ধও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে তেহরান হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যায়, যার চাপ পড়ে মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও।

যুদ্ধটি যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিকের কাছে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত মাগা (মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন) গোষ্ঠীর অনেকেও এ সামরিক অভিযানকে তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির পরিপন্থী হিসেবে দেখেছেন। কারণ, নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প নতুন কোনো যুদ্ধে জড়াবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

এক জরিপে ৬৩ শতাংশ মার্কিনি জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অন্যদিকে, ৭৪ শতাংশ ভোটার বলেছেন, নির্বাচনে তাঁদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্তে ইরান যুদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্পও এ যুদ্ধের প্রভাবের কথা স্বীকার করেন। তবে ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে ঠেকাতে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া তাঁর সামনে অন্য কোনো পথ খোলা ছিল না।

ডেমোক্র্যাটদের কৌশলী প্রচারণা
নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্যের পেছনে প্রার্থীদের প্রচারণার ধরনও বড় ভূমিকা রেখেছে। তাঁরা জাতীয় রাজনীতির বিতর্কের বাইরে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানোসহ ভোটারদের সরাসরি প্রভাবিত করে এমন বিষয়গুলো ছিল তাঁদের প্রচারণার মূল উপজীব্য।

টেক্সাসের সাবেক শিক্ষক জেমস টালারিকো এবং কানসাসের যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন নিজেদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিষয়গুলো সামনে এনে ভোটারদের সমর্থন আদায় করেন। সাউথ ক্যারোলাইনায় অপ্রত্যাশিত জয় পান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুস। সাবেক এই শিশু বিশেষজ্ঞ নির্বাচনী প্রচারণায় স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব দেন।

অন্যদিকে, মিশিগানে জয়ী আব্দুল এল-সায়েদ রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সাধারণ মানুষের আয় বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন। জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত সিনেটর জন অসফও জীবনযাত্রার ব্যয় ও দুর্নীতির বিষয়কে প্রচারণার কেন্দ্রে রাখেন। রাজ্যটিতে ট্রাম্প দুবার জয়ী হলেও ৩৯ বছর বয়সী এই ডেমোক্র্যাট নেতার সহজ জয় তাঁর ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

ডেমোক্র্যাটদের প্রচারণার কৌশল যে কার্যকর হয়েছে, তা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন ট্রাম্পও। তিনি প্রতিপক্ষের নির্বাচনী প্রচারণার প্রশংসা করে বলেছেন, ডেমোক্র্যাটরা ভালো কাজ করেছেন। বিপরীতে, টেক্সাসের কেন প্যাক্সটনের মতো কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী সাধারণ ভোটারদের প্রধান উদ্বেগগুলো যথাযথভাবে গুরুত্ব না দেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন।

ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটা
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা। মূল্যবৃদ্ধি ও ইরান যুদ্ধের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন তিনি। ফলে এসব বিষয়ে ভোটারদের ক্ষোভের প্রভাব পড়েছে তাঁর দলের প্রার্থীদের ওপরও।

শুধু বিরোধী দলের সমর্থকদের মধ্যেই নয়, রিপাবলিকানদের নিজস্ব ভোটব্যাংকেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর ফলে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁকে সমর্থন দেওয়া কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে এবার রিপাবলিকান প্রার্থীদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হয়েছে।

নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প ভোটারদের এমনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান, যেন ব্যালটে তাঁর নিজের নামই রয়েছে। কিন্তু তাঁর এই কৌশল প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি। বরং রিপাবলিকানদের প্রচারণায় ট্রাম্পকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত দলটির জন্য উল্টো ফল বয়ে এনেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

নির্বাচনের আগে পরিচালিত বিভিন্ন জনমত জরিপেও দেখা যায়, মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের প্রতি ট্রাম্পের আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অধিকাংশ ভোটার। অথচ ওয়াশিংটন ডিসিতে নির্বাচনের আগে দেওয়া শেষ ভাষণে তিনি নিজের বাসভবনের পেছনের রিফ্লেক্টিং পুলের সংস্কারকাজ নিয়ে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন। ভোটারদের অর্থনৈতিক উদ্বেগের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের এই দূরত্বও নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের সমর্থন হারানো
২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশের সমর্থন পেয়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। ট্রাম্পের জয়ের ক্ষেত্রে এই ভোটারদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তবে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সেই সমর্থনের চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে।

বিশেষ করে টেক্সাস-মেক্সিকো সীমান্তবর্তী হিস্পানিক-অধ্যুষিত কংগ্রেসীয় আসনগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য রিপাবলিকানদের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের ওই অঞ্চলের তিনটি আসনেই জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় হিস্পানিক-সংখ্যাগরিষ্ঠ কাউন্টিগুলোতে রিপাবলিকান সিনেট প্রার্থীদের সমর্থন ২২ শতাংশের বেশি কমেছে। অভিবাসন নীতি নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি অসন্তোষ বেড়েছে।

পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ৫৬ শতাংশ মানুষ অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা আইসিইর (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট) প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। একই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ-অধ্যুষিত কাউন্টিগুলোতেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন বেড়েছে।

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক চাপ, ইরান যুদ্ধের প্রভাব, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং গুরুত্বপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সমর্থন হারানো—এই পাঁচটি বিষয় রিপাবলিকানদের নির্বাচনী বিপর্যয়কে ত্বরান্বিত করেছে বলে বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।