রাজধানীর রাজপথ ছিল আওয়ামী লীগের দখলে


hadayet প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ১২, ২০২৩, ৩:৩১ পূর্বাহ্ন /
রাজধানীর রাজপথ ছিল আওয়ামী লীগের দখলে

দিনভর সতর্ক অবস্থানে রাজধানীর রাজপথ ছিল অনেকটাই আওয়ামী লীগের দখলে। বিএনপি ও তার মিত্রদের গণঅবস্থান কর্মসূচি চলাকালে গতকাল বুধবার রাজধানীজুড়ে সরকার সমর্থক নেতাকর্মীর কড়া পাহারা দেখা গেছে। আন্দোলন কর্মসূচির নামে সরকারবিরোধীদের সম্ভাব্য নৈরাজ্য ঠেকাতে বিভিন্ন স্থানে মিছিল, সমাবেশ এবং আলোচনা সভার মাধ্যমে শোডাউনও করেছেন তাঁরা।
এদিন রাজধানীতে কমপক্ষে পাঁচটি স্পটে বড় ধরনের সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো। এর মধ্যে রাজধানীর দুই প্রান্তে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা হয়েছে। যদিও বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে সভা দুটি কার্যত বিএনপি ও তার মিত্রদের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যবিরোধী গণসমাবেশে পরিণত হয়েছিল। যুবলীগ ফার্মগেট ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আলাদা দুটি সমাবেশ করেছে। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মী দিনব্যাপী সতর্ক অবস্থান ছিল।

মহানগরীর সব ওয়ার্ড এবং এলাকাগুলোতেও দিনভর নেতাকর্মীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল ও সভা-সমাবেশ করেছেন। প্রধান প্রধান সড়ক ছাড়াও অলিগলিতে ছিল নেতাকর্মীর অবস্থান।
কোথাও কোথাও মোটরসাইকেল মহড়াও দেখা গেছে।

ভুয়া… ভুয়া… ভুয়া… এটা গরুর হাট- ওবায়দুল কাদের
সকাল থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের বিভিন্ন থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিটের আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড় হতে থাকেন। সেখানে অবস্থান নিয়ে কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের নেতৃত্বে দফায় দফায় মিছিল করেছেন নেতাকর্মীরা। এ সময় বিএনপি ও তার মিত্রদের সন্ত্রাস ও নৈরাজ্যবিরোধী স্লোগানে স্লোগানে মুখর ছিল বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ এবং গুলিস্তানসহ আশপাশের এলাকা। কয়েক দফায় নেতাকর্মীরা মোটরসাইকেলে মহড়াও দিয়েছেন। দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা হয়।
এ সভায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপির আন্দোলন ভুয়া। তারা বলেছিল, ১০ ডিসেম্বর এই নগরীতে বিজয় মিছিল হবে। এমনও কথা বলেছিল, তারেক রহমান এসে নেতৃত্ব দেবেন। আর খালেদা জিয়া জেল থেকে এসে বিজয় মিছিলের নেতৃত্ব দেবেন। সরকারের পতন অনিবার্য! কী হলো? তাদের ১০ ডিসেম্বর ভুয়া, ৩০ ডিসেম্বর ভুয়া।
বিএনপিসহ ৫৪ দল ও সংগঠনের গণঅবস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজকে খবর জানেন, পল্টনে মোটামুটি একটা সমাবেশ হয়েছে। ১২-দলীয় জোট দেখলাম বিজয়নগরে সমাবেশ করছে। সব মিলিয়ে ২৪ জন। ৭-দলীয় জোট প্রেস ক্লাবের সামনে চেয়ার পেতে বসে আছে। মঞ্চে ২০ জন, সামনে সাংবাদিকসহ আরও ১৫ জন। দুপুর ১টা পর্যন্ত তিন দল উপস্থিত ছিল, চার দল নেই। তারা বসে আছে ফুটপাতের ওপর। মঞ্চ ও স্রোতা সেখানেই। সবাই ফুটপাতকেন্দ্রিক। তারপর এলডিপির কর্মসূচিতেও দেখলাম সেই দৃশ্যপট। কয়েকজন হাতেগোনা বসে আছে। ৫৪ দল আজকে একজন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। কী হবে? ঘোড়ার ডিম পাড়বে। ৫৪টি ঘোড়ার ডিম পাড়বে ৫৪টি বিরোধী রাজনৈতিক দল। ভুয়া… ভুয়া… ভুয়া… এটা গরুর হাট।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওরা নাকি রাষ্ট্রকে মেরামত করবে! যারা দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়েছে, তারা কী মেরামত করবে? মেরামত তো করেছেন শেখ হাসিনা। ওরা আবারও ক্ষমতা পেলে রাষ্ট্রকে ধ্বংস করবে। তারা ক্ষমতায় এলে এ দেশের গণতন্ত্র বাঁচবে না। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার আদর্শ বাঁচবে না। গণতন্ত্রের বস্ত্রহানি ঘটবে। জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার পৃষ্ঠপোষক বিএনপি নামক এই অপশক্তির হাতে ক্ষমতা আমরা তুলে দিতে পারি না।’

ওবায়দুল কাদের বলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং উত্তর আওয়ামী লীগ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনা সভা করছে। কিন্তু কোনো কোনো অনলাইনে লেখা হয়েছে, আওয়ামী লীগ নাকি পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দিয়েছে। এটা পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি নয়। আগে থেকেই এই কর্মসূচির পরিকল্পনা ছিল। বিএনপি তার কর্মসূচি করেছে। আওয়ামী লীগ নিজেদের কর্মসূচি করেছে। তাছাড়া ১০ জানুয়ারি (বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস) বিএনপির হৃদয়ে নেই, চেতনায়ও নেই। তাই ১০ জানুয়ারি তারা পালন করেনি।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফীর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন- আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল-আলম হানিফ, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সবুর, উপ-প্রচার সম্পাদক সৈয়দ আব্দুল আউয়াল শামীম, কেন্দ্রীয় কার্যনিবাহী সদস্য অ্যাডভোকেট সানজিদা খানম, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির, কৃষক লীগের সভাপতি সমীর চন্দ, মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মেহের আফরোজ চুমকি, স্বেচ্ছাসেবক লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গাজী মিছবাউল হোসেন সাচ্চু প্রমুখ।

‘বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূত মাথা থেকে নামাতে হবে’
বিকেলে মিরপুর-১ নম্বরের ঈদগাহ মাঠে ঢাকা মহাগর উত্তর আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় ওবায়দুল কাদের বলেন, বিএনপিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ভূত মাথা থেকে নামাতে হবে। নির্বাচন হবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যেভাবে হয় সেভাবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনা করবে। তখন সরকার নির্বাচনকালীন রুটিন দায়িত্ব পালন করবে। সেই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হবেন শেখ হাসিনা।
বিএনপির গণঅবস্থানকে ঘিরে ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরে আক্রমণের অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, ‘খোঁজ নিয়ে দেখলাম, সবই ভুয়া। তারা সব সময়ই মিথ্যা কথা বলে। মানুষ কেন তাদের ভোট দেবে? মিথ্যাচার, ইতিহাস বিকৃতি, স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন আর দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য? বিএনপি মানেই ভুয়া। বিএনপির দুর্নীতি, ভোট চুরি, প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে খেলা হবে।’
দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, পাকিস্তানের রাজাকার-আলবদরের দোসর বিএনপি-জামায়াত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছে। তাদের প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, বিএনপি বলেছিল, তারা নাকি সরকারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবে? এই সরকারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়। ডিসেম্বরের ১০ তারিখে একবার বিএনপির কোমর ভেঙেছে। নৈরাজ্যের চেষ্টা করলে আবারও ভাঙবে।
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ বজলুর রহমানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক এসএম মান্নান কচির সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন- আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার, সংসদ সদস্য সাদেক খান, আগা খান মিন্টু প্রমুখ।

বিএনপি নেতাদের জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে- নানক
যুবলীগের নেতাকর্মীরা সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় মিছিল ও স্লোগান দিয়েছেন। এদিন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের উদ্যোগে রাজধানীর ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের উদ্যোগে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সমাবেশ হয়।
ফার্মগেটের সমাবেশে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের নেতারা সরকার পতনের ডাক দিয়ে তাঁদের নেতাকর্মীদের বারবার বিভ্রান্ত করছেন। সরকার পতন এত সহজ নয়। কারণ এই সরকার জনগণের সরকার। মির্জা ফখরুলসহ বিএনপি নেতারা যদি সরকারের পতন করতে না পারেন, তাহলে পল্টন কার্যালয়ের সামনে তাঁদের কান ধরে উঠবস করে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।

পৃথক দুই সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ূয়া, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন বাবুল, সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন, মহানগর দক্ষিণের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রেজাসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতারা।

শাহবাগে ছাত্রলীগের অবস্থান
শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে দিনভর সতর্ক অবস্থানে ছিলেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, ঢাকা কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ, সরকারি অ্যাপ্লাইড সায়েন্স কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ইউনিট ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থানে যোগ দেন। অবস্থান কর্মসূচি চলাকালে সমাবেশে ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা বক্তব্য দেন।