ফিটনেসবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্য


hadayet প্রকাশের সময় : মার্চ ২৭, ২০২৩, ৪:১৮ পূর্বাহ্ন / ২৮
ফিটনেসবিহীন গাড়ির দৌরাত্ম্য

রাজধানীর রাস্তায় চলে ৫ লাখ ৭৭ হাজার – মাত্র দুই বছরেই বেড়েছে ১ লাখ- লক্কড়ঝক্কড় বাস চলছে বেপরোয়া ঘটছে দুর্ঘটনা

ফিটনেসবিহীন ও লক্কড়ঝক্কড় বাসের দৌরাত্ম্য বেড়েছে রাজধানীর সড়কে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এসব পরিবহনের সংখ্যাও। ২০২১ সালে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বলেছিলেন রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন পরিবহনের সংখ্যা ৪ লাখ ৮১ হাজার ২৯টি। বর্তমানে এসব পরিবহনের সংখ্যা ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১টি। অর্থাৎ দুই বছরে এ ধরনের পরিবহনের সংখ্যা বেড়েছে ৯৫ হাজার ৯৭২টি। শুধু রাজধানীতে ফিটনেসবিহীন বাস ও মিনিবাসের সংখ্যা ৩২ হাজার ৯০৮টি।

বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীতে মোট পরিবহন নিবন্ধিত হয়েছে ১৯ লাখ ৭৬ হাজার ৮৯৮টি। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন পরিবহনের সংখ্যা ৫ লাখ ৭৭ হাজার ১টি। রাজধানীতে বাসের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৯১৯টি। যার মধ্যে ২১ হাজার ৪৪৫টি বাসের ফিটনেস নেই। এ ছাড়া ১১ হাজার ৪৬৩টি মিনিবাস, অ্যাম্বুলেন্স ৩ হাজার ৯৫, অটোরিকশা ১ লাখ ৯৪ হাজার ১৪৭, অটোটেম্পো ৫ হাজার ৪৮৩, প্রাইভেট কার ৬১ হাজার ৮২৯, কার্গোভ্যান ১ হাজার ৮৪১, কাভার্ড ভ্যান ৭ হাজার ৮৮০, জিপ ১৩ হাজার ৮২৮, মাইক্রোবাস ২৬ হাজার ৮৭০, পিকাপ ৬৮ হাজার ৪৭৭ ও টেক্সিক্যাব ৬ হাজার ৮৫৪টির ফিটনেস নেই।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, ঢাকা মহানগরীতে চলমান বাস-মিনিবাসের মধ্যে প্রায় ৬৮ শতাংশের দরজা-জানালা ভাঙা। বসার সিট ছেঁড়া। ৮০ শতাংশ বাস-মিনিবাসের সিটে দুই স্তরের কাঠামো (স্টিল ও ফোম/কাপড়) নেই। আর যেসব বাসে স্টিলের কাঠামোর ভিতর ফোম বা কাপড়ের স্তর রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশও ছেঁড়া। তাছাড়া রাজধানীর অধিকাংশ বাসের পেছনের সিগন্যালিং লাইটগুলো অকেজো। কিছু কিছু বাস-মিনিবাসে পাখা থাকলেও বেশির ভাগই নষ্ট থাকে। রাজধানীতে চলাচলকারী প্রায় ৫০ হাজার বাস-মিনিবাসের মধ্যে অর্ধেকের বেশির অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল (২০ বছর) পেরিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে রাজধানীতে চলাচলকারী ৬৫ শতাংশ বাস-মিনিবাসই ফিটনেসবিহীন। ২০১০ সালে রাজধানীতে ২০ বছরের অধিক পুরনো বাস-মিনিবাস চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়। ওই সময় একবার অভিযান চালানো হলে অনেকেই পুরনো বাস-মিনিবাস বন্ধ করে রাখেন। কিন্তু অভিযান শেষে আবারও পুরনো, ফিটনেসবিহীন বাস-মিনিবাস নামানো হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ব্যক্তিগত গাড়ি ছাড়া সব বাণিজ্যিক গাড়ির ফিটনেস সনদের মেয়াদ এক বছর। শুধু প্রাইভেট কার ও জিপসহ ব্যক্তিগত গাড়ির ফিটনেসের মেয়াদ দুই বছর। যে কোনো গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার ক্ষেত্রে ৫৯টি বিষয় দেখা হয়। কিন্তু ওসব বিষয় পুরোপুরি যাচাই করলে সারা দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ গাড়ি ফিটনেস পাবে না। সেক্ষেত্রে শুধু ন্যূনতম বিষয়গুলো দেখা হয়। ডিটিসিএ-এর তথ্যানুযায়ী, রাজধানীতে ঢাকা মেট্রোপলিটন রিজিওনাল ট্রান্সপোর্ট কমিটির অনুমোদিত রুটের সংখ্যা ৩৮৬টি। এর মধ্যে সর্বশেষ মাঠপর্যায়ে বিআরটিএ তদন্ত করে মাত্র ১২৮টি রুটে বাস-মিনিবাস চলাচলের প্রমাণ পেয়েছে।

অন্যদিকে ২৫৮টি রুটেই বর্তমানে কোনো বাস-মিনিবাস চলছে না। এসব রুটে যেমন যাত্রীদের ভোগান্তি হচ্ছে, অন্যদিকে এসব রুট বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে। বর্তমানে ১২৮টি রুটে ৭ হাজার ৯১টি বাস-মিনিবাস চলাচল করে। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট রুটে নিয়ম অনুযায়ী চলে ৩ হাজার ৪২৭টি। আর অন্যান্য রুটে চলছে ২০১৮টি বাস-মিনিবাস। এর মধ্যে রুট পারমিট ছাড়াই চলাচল করছে ১ হাজার ৬৪৬টি পরিবহন। অন্যদিকে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির তথ্যানুযায়ী রাজধানীতে মাত্র ৯৭টি রুটে বাস চলাচল করে। এর মধ্যে মহানগরীতে ৬০টি রুটে আর গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলা থেকে রাজধানীতে চলে এমন রুট ৩৭টি।

এ বিষয়ে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাস মালিকরা সবাই সমান নয়। কেউ কথা শুনে আবার কেউ কথা শুনে না। মালিকদের বলা হয়েছে ফিটনেসবিহীন বাস, লক্কড়ঝক্কড় ও রং উঠানো বাস সড়কে না নামানোর জন্য। তারপরেও কিছু মালিক অতি লোভে সড়কে বাস নামাচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যেতে বিআরটিএকে বলেছি। এখন বিআরটিএ ব্যবস্থা নিলে হয়। জানতে চাইলে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, সবশেষ চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফিটনেসবিহীন পরিবহনের সংখ্যা ৫ লাখ ৭৭ হাজার। তবে এসব পরিবহনের মধ্যে অনেক পরিবহন সড়কে নেই। এ ছাড়াও ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিকদের খুদে বার্তা বা এসএমএসের মাধ্যমে ফিটনেস হালনাগাদের জন্য নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে। ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে অর্থদন্ড, কারাদন্ড, ডাম্পিংসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তারপরও মালিকদের একটি বড় অংশ বিষয়টি কর্ণপাত করছেন না। এ বিষয়ে গত বুধবার সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেছেন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত চলছে। আমরা যদি ২০১০ ও ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান দেখি, তাহলে খেয়াল করব আমাদের সড়ক ও যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। অপরিপক্ব লোকের হাতে যানবাহন চলে গেছে। এ নিয়ে পুলিশ, এনজিওসহ আমরা কাজ করছি।