‘নারীদের আত্মনির্ভরশীল করাই আমার স্বপ্ন’


hadayet প্রকাশের সময় : মার্চ ১৪, ২০২৩, ৯:৫৮ পূর্বাহ্ন / ৯২
‘নারীদের আত্মনির্ভরশীল করাই আমার স্বপ্ন’

‘DigitAll-এ আত্মনির্ভরশীল’ তৃষ্ণা দিওর গল্প

ছেলেরা যা করতে পারে, মেয়েরা তা করতে পারে না—যুগ যুগ ধরে চলে আসা সমাজের চিরচেনা এ ধারণা যাঁরা পরিবর্তন করেছেন, তৃষ্ণা দিও তাঁদের একজন। তিনি পেশায় একজন ফ্রিল্যান্সার; আউটসোর্সিংয়ের কাজ করেন। তবে শহরে থেকে নয়, কাজটি তিনি করছেন গ্রামীণ নিভৃত পরিবেশে, শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নে বসে।

বাংলাদেশের একটি গ্রামে থেকেই কীভাবে বিভিন্ন দেশ থেকে আয় করছেন তৃষ্ণা? গল্পটা জানতে একটু পেছনে ফেরা যাক। ২০১৯ সালে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ থেকে ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে স্নাতকোত্তর (এমবিএ) সম্পন্ন করে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে মানবসম্পদ বিভাগে চাকরি নেন তিনি। কাজের ধরনের সঙ্গে সেভাবে মানিয়ে নিতে পারেনি বলে করোনার সময় চাকরি ছেড়ে চলে যান নিজ গ্রামে। গ্রামে বসেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির আবেদন করে যান, কিন্তু সেভাবে সাড়া মেলেনি।

বর্তমানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ করে প্রতি মাসে গড়ে দুই লাখ টাকা আয় করছেন তৃষ্ণা। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আশপাশের জেলার ছেলেমেয়েদের।

এমন সময় পরিচিত একজনের কাছ থেকে জানতে পারলেন, ফ্রিল্যান্সিং করেও আয় করা সম্ভব। কিন্তু কাজ তো শিখতে হবে। বিভিন্ন অনলাইন প্রতিষ্ঠানে ফি পরিশোধ করেও প্রতারণার শিকার হন তৃষ্ণা দিও। অবশেষে খোঁজ পান ময়মনসিংহের নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটের। দেরি না করে ভর্তি হন গ্রাফিক ডিজাইন কোর্সে। প্রতি শুক্র ও শনিবার নিজের গ্রাম থেকে ময়মনসিংহে যেতেন ক্লাস করতে। সন্ধ্যা ছয়টায় ক্লাস শেষে বাসায় ফিরতে রাত ১০টা বাজত। বাসায় এসেই যা শিখেছেন চর্চা করতেন।

মাঝেমধ্যে টেরও পেতেন না সকাল কখন হয়েছে। এমনও হয়েছে, তিন রাত টানা ঘুমাননি। এতটাই নিমগ্ন থাকতেন কাজ শেখার প্রতি। প্রায় ছয় মাস পর প্রথম যেদিন বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৮৬ ডলারের কাজের প্রস্তাব পান, তখন তাঁর আগ্রহ আরও প্রবল হয়। অজান্তেই বলে ফেলেন ‘সম্ভব’।

বর্তমানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাজ করে প্রতি মাসে গড়ে দুই লাখ টাকা আয় করছেন তৃষ্ণা। পাশাপাশি আউটসোর্সিংয়ের ওপর প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আশপাশের জেলার ছেলেমেয়েদের, যাঁদের অনেকেই নামমাত্র ফি দিচ্ছেন, অনেকেই আবার শিখছেন একদম বিনা মূল্যে। কারণ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা থেকে শিক্ষার্থীর আগ্রহটাকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন তৃষ্ণা দিও।

তৃষ্ণা বলেন, ‘আমি যখন গ্রামে ফিরেছিলাম, সবাই বলাবলি করতে লাগল, নিশ্চয়ই আমি এমন কিছু করেছি, যার কারণে আমার চাকরি চলে গেছে। ঘরে বসে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করতাম বলে আমাকে তাঁরা দেখত না। সে জন্য এটাও আমাকে শুনতে হয়েছে, সম্ভবত তৃষ্ণা অন্তঃসত্ত্বা, না হলে বাসা থেকে বের হয় না কেন?’

চারপাশের মানুষের এমন বিরূপ মন্তব্যের জবাব তৃষ্ণা দিয়েছেন কাজের মাধ্যমে। হয়েছেন সফলও। বর্তমানে ৪০ জন শিক্ষার্থীকে কাজ শেখাচ্ছেন তিনি। অথচ এমনও দিন গেছে, গ্রামে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার কারণে তিনি আইপিএস দিয়ে কাজ করতেন। কিন্তু বেশিক্ষণ কাজ করতে পারতেন না। তবু মাসে তাঁর উপার্জন হতো প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ওই সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকলে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করা সম্ভব হতো।

তারপর ২০২২ সালের ২৩ আগস্ট প্রথম আলোয় তৃষ্ণা দিওকে নিয়ে একটি সংবাদ ছাপা হয়, যা দৃষ্টি কাড়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদের। পূরণ হয় তৃষ্ণার চাওয়া। দ্রুত সমাধান হয়ে যায় তাঁর গ্রামের বিদ্যুৎ-সমস্যা ও দ্রুতগতির ইন্টারনেটের। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তৃষ্ণার বাসায় এসে দিয়ে যান পাঁচটি কম্পিউটার।
নানা প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে স্বনির্ভর হওয়ার পর এখন তৃষ্ণার স্বপ্ন কী? তৃষ্ণা দিও বলেন, ‘নারীদের আত্মনির্ভরশীল করাটাই আমার পরিকল্পনা। স্বনির্ভর হয়ে তারা পরিবারকে সহযোগিতা করবে, সমাজের উপকার করবে—এটাই আমার স্বপ্ন।’

নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য তৃষ্ণা গড়েছেন একটি প্রতিষ্ঠান, যেটির নাম দিয়েছেন তাঁর শিক্ষার্থীরাই। যেহেতু অনেক প্রত্যাশা নিয়ে তারা তৃষ্ণা দিওর মতো হতে এসেছে, তাই প্রতিষ্ঠানটির নাম রাখা হয়েছে ‘প্রত্যাশা আইটি ইনস্টিটিউট’।

এ ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে আগ্রহী নারীদের প্রত্যাশা পূরণ করাই এখন তৃষ্ণা দিওর লক্ষ্য।