চট্টগ্রামে মেয়রের বাড়িতেও হাঁটু পানি, জলাবদ্ধতায় সেই ১০ স্পটে ভোগান্তি চরমে


hadayet প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৬, ২০২৩, ৩:১২ পূর্বাহ্ন / ১২০
চট্টগ্রামে মেয়রের বাড়িতেও হাঁটু পানি, জলাবদ্ধতায় সেই ১০ স্পটে ভোগান্তি চরমে

দুই দিনের থেমে থেমে বৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা। গত দুইদিনে জোয়ারের পানি আর বৃষ্টির পানি মিশে তলিয়ে গেছে নগরের অধিকাংশ এলাকা। দিনে বৃষ্টি কম হলেও রাতের বৃষ্টিতে ডুবে যাচ্ছে চট্টগ্রাম। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় যে ১০টি স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে তাতে কোথাও কোমর পানি আবার কোথাও হাঁটু পানি।

এতে দুর্ভোগের শেষ নেই নগরবাসীর। এছাড়াও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নীচু এলাকায় বাড়তে থাকে জোয়ারের পানি। আর এতে কোমর পানিতে ডুবে যায় নিম্নাঞ্চলগুলো। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা আগেই বলেছিলেন, বৃষ্টি হলেই নগরীর ১০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে।

চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন বিগ্রেডের লে. কর্নেল মো. শাহ আলী বলেন, বৃষ্টির পানির চাইতে জোয়ারের পানির কারণে নগরবাসীর ভোগান্তি বেড়েছে। এটা পূর্ণিমার জোয়ার চলছে, এ জোয়ারে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রায় ৪ ফিটের মতো পানি বেড়েছে। ফলে চাক্তাই খাল, রাজাখালীসহ যে খালগুলোতে সিডিএ স্লুইস গেটের কাজ করছে তা যদি বাস্তবায়ন হতো তাহলে এ সমস্যা হতো না। আমাদের প্রকল্পের আওতায় খাল পরিষ্কার আছে, খালে পানি চলাচল করতেছে। তবে সিডিএ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্লুইস গেটগুলোর নির্মাণ কাজ শেষ হলে বাকলিয়া, চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না। আমাদের প্রকল্পের আওতায় ৫টি স্লুইস গেট ছিল, যার সুফল এখন মহেশখালের মাধ্যমে নগরের আগ্রাবাদ, হালিশহর এলাকাসহ সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা পাচ্ছে। সেখানে কোনো ধরনের জলাবদ্ধতা হয়নি, পানি থাকলেও তা খালে যাওয়ার জন্য যে সময় দরকার সে সময় পর্যন্ত ছিল।

সরেজমিনে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে নগরীর চাক্তাই ডাইভারশন খাল সংলগ্ন ফুলতলা বাজার, রসুলবাগ আবাসিক এলাকা, বাকলিয়া এক্সসেস রোডের সৈয়দ শাহ ওয়াপদা অফিস, মিয়াখান নগরের ইসহাক সওদাগরের পোল, তক্তার পোলের আশেপাশে এলাকায় হাঁটু পানিতে চলাচল করছে নগরবাসী। আবার হিজড়া খাল সংলগ্ন কাপাসগোলা, কাতালগঞ্জ, বাদুরতলা, পাঁচলাইশ, রাহাত্তারপুল এলাকার কোথাও কোমর পানি আবার কোথাও হাটু পানিতে ডুবে গেছে। এছাড়াও বহদ্দার হাট, তিনপুলের মাথাসহ নিম্নাঞ্চলে পানিতে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

নালা ও ড্রেন পরিষ্কার না থাকায় সড়ক ও অলি-গলি থেকে পানি খালে যেতে সময় লেগেছে। ফলে নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকায় দোকান-ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বাসা-বাড়িতে বৃষ্টির পানি প্রবেশ করেছে। অন্যদিকে, সড়কের উপরে বৃষ্টির পানির সাথে জোয়ারের নোংরা পানি যোগ হয়েছে। সেই নোংরা পানি ডিঙিয়ে যাতায়াত করছে সাধারণ মানুষ। এছাড়া, নগরীর খোলা ডাস্টবিনের ময়লা জোয়ার ও বৃষ্টির পানিতে মানুষের বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছে।

এদিকে টানা দ্বিতীয় দিনেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরীর বাসভবনে ছিল হাঁটু পানি। নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বহদ্দারবাড়ির রেজাউল করিম চৌধুরীর নিজ বাসভবনে তিনি পানিবন্দি হয়ে পড়েন। পরে রিকশা করে তিনি বাসা থেকে বের হয়ে দিনের কাজ সম্পাদনা করেন। রিকশা করে যাওয়ার সময় মেয়র গণমাধ্যমকে বলেন, নগরের জলাবদ্ধতার জন্য নগরবাসী সিটি করপোরেশনকে গালাগাল করছে। জলাবদ্ধতা প্রকল্পের সাথে সিটি করপোরেশনের কোন হাত নেই। আমিও বলেছি আমাদের কাউন্সিলরদের সাথে সমন্বয় করে কাজ করার জন্য, কিন্তু সিডিএ তাদের মতো করে কাজ করছে।

নগরীর বাকলিয়ার বাসিন্দা আবদুল গফুর বলেন, সৈয়দ শাহ রোড, ওয়াপদা এদিকে আগে সেভাবে পানি উঠতো না। এখন বৃষ্টি আসলেই পানি জমে থাকে। এছাড়াও খাল ও নালার সংস্কার কাজ চলার কারণে পানি চলাচল করতে পারছে না। যার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানি জমে থাকে। বেশিরভাগই পানিতে দুর্গন্ধ আর ময়লা আবর্জনায় ভরা। এসব পানিতে হেটে যে বাইরে যা সে অবস্থাও নেই, এসব পানি হাটলেই পা চুলকানো শুরু করে।

অপরদিকে টানা বর্ষণে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের নীচু এলাকায়ও পানি প্রবেশ করেছে। এতে করে কয়েক শতাধিক দোকান ও গোডাউনে পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও চাক্তাই এলাকার নয়া মসজিদ, রাজাখালী, বউ বাজার এলাকায় কোথাও হাঁটু পরিমাণ, আবার কোথাও কোমর সমান পানিতে ডুবে গেছে। এসব এলাকায় অনেক দোকান ও গুদামে পানি ঢুকেছে। চাক্তাই ছাড়াও আসাদগঞ্জের মসজিদ গলি, কলা বাগিচা এলাকা পানিতে থৈ থৈ করছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাক্তাই খাল থেকে প্রয়োজনীয় মাটি দ্রুত উত্তোলন করতে হবে। একইসাথে চাক্তাই খালের মুখে নির্মিত স্লুইস গেটগুলো যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নতুবা চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হবে না।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিডিএ’র ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় একনেক। তিন বছর মেয়াদি এই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় শেষ হয় ২০২০ সালের জুন মাসে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন ও ব্যয় বাড়িয়ে ১০ হাজার কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানা যায়। তবে এখনো সংশোধিত প্রকল্পের অনুমোদন মিলেনি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমঝোতা চুক্তি (এমওইউ) স্বাক্ষর করে সিডিএ। এরপর ২৮ এপ্রিল প্রকল্পের কাজ শুরু হয়।