
► হরমুজে প্রজেক্ট ফ্রিডম সাময়িক স্থগিত : ট্রাম্প
► শুধু ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিই গ্রহণ : আরাগচি
► ইরানে অভিযান সমাপ্ত : রুবিও
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কাছাকাছি পৌঁছেছে। গতকাল এই শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানের একটি সূত্র বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছাতে হরমুজ প্রণালিতে অপারেশন ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ সাময়িক স্থগিত ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সমঝোতায় রাজি না হলে ইরানে আগের চেয়ে তীব্র হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি। জবাবে শুধু ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ চুক্তিই গ্রহণ করা হবে বলে জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
পাকিস্তানি সূত্রের বরাত দিয়ে গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, যুদ্ধ অবসানে দুই দেশ এখন সমঝোতার চূড়ান্ত পর্যায়ে। শান্তি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, আমরা খুব দ্রুতই এ প্রক্রিয়ার সমাপ্তি টানব। আমরা (সমঝোতার) একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছি।
এর আগে, এক প্রতিবেদনে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওস জানায়, যুদ্ধ বন্ধ ও বিস্তারিত পারমাণবিক আলোচনার একটি কাঠামো তৈরি করতে ইরানের সঙ্গে এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত আরও দুটি সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে ইরানের জবাব আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধ শুরুর পর দুই পক্ষ এবারই চুক্তির সবচেয়ে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে।
সমঝোতার খসড়া অনুযায়ী, ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করবে এবং আটকে থাকা কয়েক শ কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেবে। উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা সব বিধিনিষেধ তুলে নেবে। এই অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করা হবে। এরপর শুরু হবে ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনা। এ সময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চূড়ান্ত ও বিস্তারিত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হবে।
দুটি সূত্রের দেওয়া তথ্য বলছে, এই আলোচনা ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় হতে পারে। এক পৃষ্ঠার এই ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক নিয়ে বর্তমানে দরকষাকষি চলছে। মূল দরকষাকষি চলছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ নিয়ে। তিনটি সূত্র বলছে, এই মেয়াদ হবে অন্তত ১২ বছর। তবে আরেকটি সূত্র জানায়, এটি ১৫ বছর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরান পাঁচ বছরের প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের দাবিতে অটল ছিল। সূত্রটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিতে এমন একটি শর্ত যুক্ত করতে চায়, যাতে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের নিয়ম ভাঙলে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও বেড়ে যাবে। আর এই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে। সমঝোতা স্মারক সফল করতে হরমুজ প্রণালিতে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, আমরা পরস্পর একমত হয়েছি যে, অবরোধ পূর্ণ শক্তিতে কার্যকর থাকলেও প্রজেক্ট ফ্রিডম স্বল্প সময়ের জন্য স্থগিত থাকবে। পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশের অনুরোধ এবং ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত (শান্তি) চুক্তিটি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা সম্ভব কি না, তা যাচাই করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, হরমুজে আটকে পড়া বিভিন্ন দেশের জাহাজকে প্রণালিটি ছাড়তে সহায়তা করতে গত সোমবার সকাল থেকে প্রজেক্ট ফ্রিডম নামের একটি অভিযান শুরু করে মার্কিন সেনাবাহিনী। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের চেষ্টাকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের শামিল আখ্যা দিয়ে তা প্রতিরোধের ঘোষণা দেয় ইরান।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পৃথক পোস্টে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতায় রাজি না হলে ইরানের ওপর আগের চেয়েও তীব্র হামলা চালানো হবে। আর সমঝোতা হলে সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধ শেষ হবে এবং ইরানসহ সবার জন্য হরমুজ খুলে দেওয়া হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ধারণা করছি যেসব বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি সেগুলো ইরান মানবে, যদিও এটি অনেক বড় অনুমানের বিষয়। তবে যদি ইরান শর্ত মানে তাহলে ইতিমধ্যে ঐতিহাসিক অভিযানে পরিণত হওয়া এপিক ফিউরি শেষ হয়ে যাবে এবং হরমুজ প্রণালিতে অত্যন্ত কার্যকর নৌ-অবরোধ ইরানসহ সবার জন্য খুলে যাবে। কিন্তু যদি তারা শর্ত না মানে, বোমাবর্ষণ শুরু হয়ে যাবে। আর দুঃখের বিষয়, এবারের হামলা হবে আগের চেয়েও তীব্র।
জবাবে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, কোনো শক্তি প্রয়োগ করে ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা সম্ভব নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, কেউ আমাদের আত্মসমর্পণ করাতে পারবে না এবং শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষকে জোর করে কিছু মানানো যায় না।
অন্যদিকে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক শেষে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তার দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুধু একটি ‘ন্যায্য ও পূর্ণাঙ্গ’ চুক্তিই গ্রহণ করবে। বৈঠকে আরাগচি ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেন, ইরানের স্বার্থ রক্ষা করে এমন কোনো স্থায়ী ও ন্যায়সংগত সমাধান ছাড়া তেহরান অন্য কিছু মেনে নেবে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে বেইজিংয়ের অবস্থান ও সহযোগিতার জন্য তেহরান কৃতজ্ঞ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার হবে বলেও তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
হরমুজ প্রণালিতে কার্গো জাহাজে ‘অজ্ঞাত বস্তুর’ আঘাত : যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক বাণিজ্য বিষয়ক সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে এক ‘অজ্ঞাত বস্তু’ আঘাত করেছে। একটি যাচাইকৃত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এ ঘটনা পরিবেশের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। হরমুজ প্রণালিতে আটকে পড়া জাহাজগুলোতে সন্দেহজনক কোনো কার্যকলাপ দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পরামর্শ দিয়েছে ইউকেএমটিও।
হুমকি শেষ হলেই খুলবে হরমুজ : যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি শেষ হলে হরমুজ প্রণালি আবারও খুলে দেওয়া হতে পারে ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। গতকাল এক বিবৃতিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলে ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের খবরে জানানো হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ইরানের আইআরজিসির নৌবাহিনী বলেছে, আগ্রাসিদের হুমকি শেষ হলে হরমুজ প্রণালি আবারও স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। যদিও ওই বিবৃতিটির অর্থ এখনই পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে ইরানের নিয়ম-নীতি মেনে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার জন্য জাহাজ মালিকদের ধন্যবাদ জানিয়েছে আইআরজিসি। বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, আগ্রাসিদের হুমকি শেষ হলে নতুন ব্যবস্থার আওতায় প্রণালি দিয়ে নিরাপদে ও স্থায়ীভাবে চলাচলের সুযোগ তৈরি হবে। -বিবিসি, রয়টার্স।
আপনার মতামত লিখুন :