
১৫ বছর পর পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় ঘটছে ফের পালাবদল। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পথে রয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ৩৪ বছর আগে বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছিল তৃণমূল কংগ্রেসের ‘মা-মাটি-মানুষের’ সরকার। আর এবার সেই তৃণমূলকে কার্যত ধূলিসাৎ করে ক্ষমতা দখলের পথে মোদি-অমিত শাহের দল বিজেপি। নিজের আসনেও জিততে পারেননি মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি।
রাজ্যটির ২৯৪ আসনের মধ্যে এদিন ২৯৩ আসনে (অনিয়মের অভিযোগে একটিতে ভোট স্থগিত) গণনা হয়। সরকার গড়তে দরকার ১৪৭ আসন। এর মধ্যে ২০৬ আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। ৮১ আসনে বিজয়ী হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। ছয়টি আসনে জিতেছে অন্যন্য দল। কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গতকাল এ ২৯৩ আসনের গণনা শুরু হয়। এর জন্য গোটা রাজ্যে ৭৭টি গণনাকেন্দ্র খোলা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের মোট ২৯৪ আসনে ভোট হয়েছে দুই দফায়। গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফায় ১৫২ আসনে এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২ আসনে ভোট নেওয়া হয়। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষেই বিভিন্ন বুথফেরত সংস্থার জরিপেও বিজেপির সরকারে আসার ইঙ্গিত মিলেছিল। ফের একবার সেই বুথফেরত সমীক্ষার সঙ্গে মিলে গেছে আসল ফলাফল।
এদিন ভোটের ফলাফল সামনে আসতেই কলকাতা থেকে জেলা সর্বত্র বিজেপি কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে গেরুয়া শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা। পাশাপাশি সিঙ্গুরে ঝালমুড়ি বানিয়ে, ভাগ করে খেলেন বিজেপি কর্মীরা। দেড় দশক আগে হুগলির সিঙ্গুর থেকে উত্থান হয়েছিল তৃণমূলের। সেই সিঙ্গুরেই তৃণমূল দুর্গের পতন ঘটিয়ে উত্থান হল বিজেপির। রাজ্যের মন্ত্রী বেচারাম মান্নাকে পেছনে ফেলে বিজেপির প্রার্থী অরূপ কুমার দাস এগোতেই আনন্দে ঝালমুড়ি বানিয়ে, ভাগ করে খেলেন বিজেপি কর্মীরা। আবার বুলডোজার নিয়ে অভিনবভাবে জয়ের আনন্দে মাতলেন মালদহের বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা। সেই সঙ্গে একাধিক ডিজে বাজনা এবং চলছে আবির খেলা। এমনকি দলটির রাজ্যসভার সাংসদ হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকেও উচ্ছ্বাসে মেতে উঠতে দেখা যায়। দলের কর্মী-সমর্থকরা তাকে মিষ্টিমুখ করান। এরপর বাজনার তালে তালে নৃত্য করতে দেখা যায় সাবেক এই কূটনীতিককে। এদিকে বিজেপির বড় জয়ের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পশ্চিমবঙ্গের মানুষকে নতমস্তকে প্রণাম জানিয়ে তাদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এক্স হ্যান্ডেলে মোদি লিখেছেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফুল ফুটেছে! ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। জনগণের শক্তির জয় হয়েছে এবং বিজেপির সুশাসনের রাজনীতি জয়ী হয়েছে। আমি পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যেক ব্যক্তিকে নতমস্তকে প্রণাম জানাই।’ তিনি আরও লেখেন, ‘জনগণ বিজেপিকে এক অভূতপূর্ব রায় দিয়েছেন এবং আমি তাদের আশ্বাস দিচ্ছি যে, আমাদের দল পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষা পূরণের জন্য সম্ভাব্য সবকিছু করবে। আমরা এমন একটি সরকার দেব যা সমাজের সব স্তরের মানুষকে সুযোগ ও মর্যাদা নিশ্চিত করবে।’
এবারে নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত আসন ভবানীপুর। এই আসনে তৃণমূলের প্রার্থী মমতা ব্যানার্জি, তার প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপির প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারী। ১৭ রাউন্ড গণনার শেষে ২,৯৫৬ ভোট এগিয়ে আছেন শুভেন্দু।
এরই মধ্যে নন্দীগ্রাম আসন থেকে জয়ী হয়েছেন শুভেন্দু। তিনি হারিয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থী পবিত্র করকে। ২০২৬ সালের নির্বাচনে এ দুটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু।
এদিকে বিজেপির এগিয়ে থাকার খবর আসতেই বেশ কিছু জায়গায় তৃণমূলের প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ব্যারাকপুর রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ কলেজের গণনা কেন্দ্রে নোয়াপাড়া বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী তৃণাঙ্কুর ভট্টাচার্যকে বেধড়ক মারধরের অভিযোগ ওঠে বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। বিক্ষোভকারীদের হাত থেকে তৃণাঙ্কুরকে উদ্ধার করে জওয়ানরা। আবার এই গণনা কেন্দ্রেই বীজপুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী সুবোধ অধিকারীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এর পাশাপাশি এই গণনা কেন্দ্রে ব্যারাকপুরের তৃণমূল প্রার্থী ও পরিচালক রাজ চক্রবর্তীকে ঘিরে চোর চোর স্লোগান দেখা যায়। বর্ধমানের এমবিসি গণনা কেন্দ্রের বাইরেও উত্তেজনা ছড়ায়। বিজেপি এগিয়ে যেতেই অতি উৎসাহীদের তান্ডব ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। বর্ধমান উত্তরের তৃণমূল প্রার্থীর এজেন্টকে মারতে মারতে গণনা কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। কোথাও আবার তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর করার অভিযোগ উঠেছে। ফলাফল ঘোষণার আগেই কাঁথি পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙে দেয় বিজেপির কর্মী ও সর্মথকরা। পরে তৃণমূলের প্রতীকে গেরুয়া রং লাগিয়ে সেই কার্যালয়ের দখল নেয় তারা। পশ্চিম বর্ধমানের জামুরিয়া এবং বারাবনিতে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়। অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে বিজেপির জয়ের খবর আসার পরে এদিন দুপুরে আচমকাই রাজ্যের সচিবালয় নবান্নের কাছে পৌঁছে যান বিজেপির মহিলা কর্মীরা। মুখে আবির মাখা অবস্থায়, হাতে দলীয় পতাকা নিয়ে নবান্নের সামনে তারা স্লোগান দিতে থাকেন। কিছু সময় সেখানে থাকার পরে পুলিশ তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দেয়। যদিও তার আগে নবান্নের সামনে মোতায়েন করা হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের। সূত্র খবর, নবান্ন থেকে কোনোরকম গুরুত্বপূর্ণ নথি যাতে বাইরে বেরিয়ে না যায় সেই কারণে সেখানে উপস্থিত কর্মীদের প্রবেশ ও বাইরের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হচ্ছে। এদিকে নির্বাচনে তৃণমূলের এই খারাপ ফলাফল নিয়ে দলের সিনিয়র সংসদ সৌগত রায় জানিয়েছেন, ‘২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিপিআইএম প্রার্থী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হেরে গিয়েছিলেন। রাজনীতিতে এটা হয়েই থাকে। এসআইআর ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়নি। কারণ অনেক ভোট কমে গেছে।’ বিভিন্ন জায়গায় তৃণমূলের প্রার্থীদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে সৌগত বলেন, ‘আমাদের লোকেরা প্রতিরোধ করবে। চার্চিলের উক্তি উদ্ধৃতি করে তিনি বলেন, ‘জয়ের সময় উদার হও, হেরে গেলে রুখে দাঁড়াও। আমরাও সেটাই করব। তাছাড়া এতে এত বিচলিত হওয়ার কিছু নেই।’
নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তে থাকায় মুখ খুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ শতাব্দী রায়। তার অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলকর্মীদের বাড়ি ভাঙচুর চলছে, কিন্তু পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার জেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ফোন করা হলেও কেউ ফোন ধরছেন না। ফলে সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।’
যদিও, সিউড়ি বিধানসভায় বিজেপি প্রার্থী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জয়ের পর বলেন, বাংলার মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তার কথায়, ‘বাংলার বাঙালি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসকে বিদায় জানিয়েছে।’
এদিকে ভোট গণনা চলাকালীন ভবানীপুর আসনের গণনা কেন্দ্র সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলে তৃণমূল প্রার্থী মমতা ব্যানার্জির প্রবেশ করা নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। মমতার আসার খবর পেয়ে গণনা কেন্দ্রে পৌঁছে যান শুভেন্দু অধিকারীও। একসময় প্রবল উত্তেজনা ছড়ায় ভবানীপুর আসনে। তাদের উভয়ের কাছ থেকেই মোবাইল ফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ভবানীপুর আসনের গণনা সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। নির্বাচন কমিশনের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না ওই দুই প্রার্থী গণনা কেন্দ্র থেকে বের হবেন, ততক্ষণ নতুন করে গণনার কাজ শুরু হবে না। পরে মমতা নিজেই গণনা কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যান। পরে ফের শুরু হয় গণনা।
আবার হেস্টিংস-এর গণনা কেন্দ্রে ঢোকার পরেই সেখানকার বিজেপিসহ অন্য প্রার্থীরা ও তাদের বাট কাউন্টিং এজেন্টরা কমিশনে অভিযোগ জানায়। সেই অভিযোগের প্রেক্ষিতে অভিষেককে সেই গণনা কেন্দ্র থেকে বাইরে বেরোনোর নির্দেশ দেওয়া হয়। একটা সময় তাকে দেখে তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা চোর স্লোগান দিতে থাকে। পরে দলের এই ফলাফল নিয়ে বিকালে মুখ খোলেন মমতার ভাতিজা ও দলটির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক ব্যানার্জি। অভিষেক বলেন, ‘মানুষ যে রায় দেবে, সভ্য সমাজের উচিত তা মাথা পেতে নেওয়া। এখনো গণনার অনেক সময় বাকি রয়েছে। আমি দলের কাউন্টিং এজেন্টদের বলব তারা যেন গণনা কেন্দ্র ছেড়ে না বেরে তারা যেন ধৈর্য ধরে।’
ভোট পরবর্তী সহিংসতা হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে। সন্ধ্যায় বহরমপুর থানার চুঁয়াপুর কদমতলা বটতলা এলাকায় বিজেপির বিজয় মিছিলে হামলা, কয়েকটি বাইকে ভাঙচুর, পেট্রোল ঢেলে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইটাহারের জয়ী তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী মোশারফ হোসেনের গাড়িতেও হামলা হয়েছে। রায়গঞ্জের কলেজপাড়ায় গাড়ি ভাঙচুর হলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়।
মালদা জেলার গাজোল বিধানসভা এলাকার চাকনগরে তৃণমূল কংগ্রেসের অঞ্চল সভাপতি ত্রিনাথ বিশ্বাসের বাড়ি ও দোকান ভাঙচুরের অভিযোগ উঠেছে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধে। শুভেন্দুর আসন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামেও সহিংসতা হয়েছে। তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় দখল করে ভিতরে আসবাবপত্র ভাঙচুর ও ছিঁড়ে ফেলা হয় ফেস্টুন পতাকা। মমতা ব্যানার্জির কুশপুতুল তৈরি করে জুতোর মালা পরিয়ে দেওয়া হয়। মধ্য হাওড়ার ডুমুরজলার কাছে তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস ভাঙচুর করা হয়।
দক্ষিণ দিনাজপুরের মহারাজপুর এলাকায় এক তৃণমূল নেতার মাথায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপ দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে বিজয় মিছিলে গুলিবিদ্ধ হন এক বিজেপি কর্মী।
আপনার মতামত লিখুন :