
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম আছে যারা সরাসরি রাজনীতির মঞ্চে না দাঁড়িয়েও সময়ের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখে যান। তাঁরা কখনো বক্তৃতার মাইক্রোফোনে উচ্চকণ্ঠ নন, কিন্তু নীরব উপস্থিতির মধ্যেই হয়ে ওঠেন একটি সময়ের প্রতীক। ডা. জোবাইদা রহমান তেমনই এক নাম। তিনি শুধু একজন চিকিৎসক নন, শুধু একজন রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যও নন; তিনি একজন শিক্ষিত নারী, একজন কন্যা, একজন স্ত্রী, একজন মা, একজন পুত্রবধূ, একজন পেশাজীবী এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও আত্মমর্যাদা ধরে রাখা এক সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবনের দিকে তাকালে মনে হয়, এটি যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের এক নীরব প্রতিচ্ছবি—যেখানে আছে সম্ভ্রান্ত পারিবারিক ঐতিহ্য, মেধার দীপ্তি, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, রাজনৈতিক ঝড়, নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায়, আবার আছে ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও প্রত্যাবর্তনের গল্প।
সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ডা. জোবাইদা রহমান। তাঁর জন্ম যেন এমন এক পরিবারে, যেখানে দেশপ্রেম, শৃঙ্খলা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ ছিল পারিবারিক উত্তরাধিকারের অংশ। তাঁর পিতা রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলী খান ছিলেন বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান। রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জাতীয় দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক ছিলেন তিনি। অন্যদিকে তাঁর পরিবার মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রচিন্তা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত ছিল। শৈশব থেকেই ডা. জোবাইদা রহমান বেড়ে উঠেছেন শৃঙ্খলাবোধ, সৌন্দর্যবোধ এবং জ্ঞানচর্চার এক পরিবেশে। অনেক শিশুর শৈশব যেখানে শুধু খেলাধুলা আর আনন্দে সীমাবদ্ধ থাকে, সেখানে তাঁর বেড়ে ওঠার ভেতরে ছিল বইয়ের গন্ধ, শিক্ষার অনুপ্রেরণা এবং দেশ সম্পর্কে গভীর সচেতনতা। পরিবারের সদস্যরা বিশ্বাস করতেন—সম্পদ নয়, শিক্ষাই মানুষের প্রকৃত শক্তি। সেই বিশ্বাসই ধীরে ধীরে তাঁর ব্যক্তিত্ব নির্মাণ করে।
ডা. জোবাইদা রহমানের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি তাঁর শিক্ষাজীবন। তিনি প্রমাণ করেছেন, উচ্চবংশ বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, ব্যক্তিগত মেধা ও অধ্যবসায়ই একজন মানুষকে প্রকৃত মর্যাদা দেয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি অসাধারণ মেধার পরিচয় দেন। চিকিৎসাবিজ্ঞান এমনিতেই একটি কঠিন ও শ্রমসাধ্য বিদ্যা। দীর্ঘ অধ্যয়ন, কঠোর পরিশ্রম, অসংখ্য পরীক্ষার চাপ এবং রোগীর জীবন নিয়ে দায়িত্ববোধ—সবকিছু মিলিয়ে চিকিৎসক হয়ে ওঠা সহজ নয়। কিন্তু তিনি শুধু চিকিৎসকই হননি; তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একজন মেধাবী চিকিৎসক হিসেবে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের স্বাস্থ্য ক্যাডারে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত মেধা, পরিশ্রম এবং পেশাগত দক্ষতার স্বীকৃতি।
চিকিৎসা পেশা কেবল একটি চাকরি নয়; এটি মানবসেবার অন্যতম মহান ক্ষেত্র। একজন চিকিৎসক মানুষের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে তার পাশে দাঁড়ান।
ডা. জোবাইদা রহমানও সেই পথই বেছে নিয়েছিলেন। সরকারি চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার পরিচয় দেন। তাঁর সহকর্মীরা তাঁকে একজন ভদ্র, সংযত, মার্জিত এবং দায়িত্বশীল চিকিৎসক হিসেবে জানতেন। একজন চিকিৎসকের হাতে যেমন থাকে ওষুধের প্রেসক্রিপশন, তেমনি থাকে মানুষের জীবনের প্রতি মমত্ববোধ। তাঁর কর্মজীবনের মূল ভিত্তিও ছিল সেই মানবিকতা।
১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তাঁর জীবনে আসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের সঙ্গে। এই বিয়ের মাধ্যমে তিনি যুক্ত হন বাংলাদেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক পরিবারে। তিনি হয়ে ওঠেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার
পুত্রবধূ। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হলো, রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি দীর্ঘ সময় সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থেকেছেন। তিনি বরং চিকিৎসক, মা ও পারিবারিক দায়িত্বশীল সদস্য হিসেবেই নিজেকে বেশি পরিচিত করেছেন।
একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে কোমল পরিচয়গুলোর একটি মাতৃত্ব। ডা. জোবাইদা রহমানের জীবনেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর মাতৃত্ব। তাঁর একমাত্র কন্যা জাইমা রহমান শিক্ষিত, আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এবং আইনশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষিত একজন তরুণী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। একজন মায়ের সবচেয়ে বড় সাফল্য অনেক সময় নিজের অর্জনে নয়, সন্তানের মানবিক ও শিক্ষিত মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার মধ্যে নিহিত থাকে। সেই অর্থে জোবাইদা রহমানের মাতৃত্বও একটি সফল অধ্যায়।
বাংলাদেশের রাজনীতি বহুবার উত্তাল হয়েছে। ক্ষমতার পরিবর্তন, রাজনৈতিক সংঘাত, মামলা, গ্রেপ্তার, নির্বাসন—সবকিছুই এ দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। সেই বাস্তবতার কঠিন অভিঘাত এসে পড়েছিল জোবাইদা রহমানের জীবনেও।
২০০৭-০৮ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তাঁর পরিবার নানা ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন মামলা, তদন্ত এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তাঁদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। তিনি সরাসরি রাজনৈতিক নেতা না হয়েও রাজনৈতিক বাস্তবতার ভার বহন করতে বাধ্য হন।
একজন চিকিৎসকের জন্য তাঁর পেশাগত পরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ বিদেশ অবস্থানের প্রেক্ষাপটে সরকারি চাকরি থেকে তাঁর চাকুরিচ্যুতি ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম আলোচিত ঘটনা। অনেকের কাছে এটি ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আবার তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি রাজনৈতিক হয়রানির প্রতীক। যে নারী মেধা ও প্রতিযোগিতার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় চাকরিতে প্রবেশ করেছিলেন, তাঁর কর্মজীবনের এই সমাপ্তি নিঃসন্দেহে ব্যক্তিগতভাবে বেদনাদায়ক ছিল। তবুও তিনি ভেঙে পড়েননি।
নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায়
মানুষের জীবনে কিছু সময় আসে, যখন নিজের দেশ থেকেও দূরে থাকতে হয়।
২০০৮ সালের পর লন্ডনে দীর্ঘ সময় অবস্থান তাঁর জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়। সতেরো বছরেরও বেশি সময় দেশের বাইরে কাটানো কেবল ভৌগোলিক দূরত্ব নয়; এটি মানসিক পরীক্ষারও নাম। দেশের মাটি, আত্মীয়স্বজন, স্মৃতি, শেকড়—সবকিছু থেকে দূরে থাকা সহজ নয়। তবুও তিনি ধৈর্য হারাননি। শতপ্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও জ্ঞানের সাধনা করেছেন। অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে থেমে যান। কিন্তু জোবাইদা রহমান থামেননি। লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। জ্ঞানের প্রতি তাঁর এই নিষ্ঠা প্রমাণ করে—শিক্ষা তাঁর কাছে শুধু পেশাগত প্রয়োজন নয়, বরং জীবনদর্শনের অংশ। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিকূলতা মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি তার ভেতরে শেখার আকাঙ্ক্ষা জীবিত থাকে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশ দেখা যায়।
সেখানে জোবাইদা রহমানের ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হলো তাঁর সংযম। তিনি খুব কম কথা বলেন। কিন্তু অনেক সময় নীরবতাও একটি ভাষা। একজন মানুষের ব্যক্তিত্বের গভীরতা অনেক সময় তাঁর উচ্চারণে নয়, তাঁর আচরণে প্রকাশ পায়। জোবাইদা রহমানের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটাই তেমন।
ডা. জোবাইদা রহমানের জীবন কেবল একজন ব্যক্তির জীবনকথা নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতি, সমাজ, পরিবার, শিক্ষা ও সংগ্রামের এক বিস্তৃত প্রতিচ্ছবি। তিনি নৌবাহিনী প্রধানের কন্যা, একজন চিকিৎসক, একজন শিক্ষিত মা, একজন রাজনৈতিক পরিবারের পুত্রবধূ, একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আদরের বৌমা এবং প্রতিকূল সময় অতিক্রম করা এক দৃঢ়চেতা নারী।
তাঁর জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব, মানবিকতা এবং আত্মমর্যাদা মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
সময়ের স্রোত অনেক কিছু বদলে দেয়। রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল ঘটে, ইতিহাস নতুন অধ্যায় রচনা করে। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের সংযম, প্রজ্ঞা ও নীরব মর্যাদার কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকেন। ডা. জোবাইদা রহমান তেমনই এক নাম—যাঁর জীবন আলোচনার চেয়ে অধিকতর উপলব্ধির, প্রচারের চেয়ে অধিকতর প্রজ্ঞার, আর কোলাহলের চেয়ে অধিকতর নীরব শক্তির প্রতীক।
আপনার মতামত লিখুন :