কঠোর শাস্তির মুখে আঠারো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়


hadayet প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৫, ২০২৩, ৩:৫১ পূর্বাহ্ন /
কঠোর শাস্তির মুখে আঠারো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়

সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় অনুসারে গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করতে ব্যর্থ হওয়া ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে ‘কঠোর’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৪টিতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আরও ২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকাস্থ অস্থায়ী ক্যাম্পাসেও ভর্তি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাকি ১২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টিকে তিন মাস ও ৬টিকে ছয় মাসের সময় দিয়ে ‘চূড়ান্ত’ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সংশ্নিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি স্থানান্তর করতে ব্যর্থ হলে সেগুলোতেও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ ঘোষণা করা হবে। সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে গত ১ জানুয়ারি সংশ্নিষ্ট ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে চিঠি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুসারে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে বাধ্য। তবে দেশের বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই দশকেও স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়তে পারেনি। ভাড়া বাড়িতে পরিচালিত হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠান। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আবার আবেদন করে সরকার থেকে দফায় দফায় সময় বাড়িয়ে নিয়ে চলছে।

বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসের বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউজিসি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো- প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আশা ইউনিভার্সিটি ও ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি। এরই মধ্যে কয়েক দফা সময় নেওয়ার পরও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়তে আরও তিন বছর অতিরিক্ত সময় চেয়েছিল। তবে সরকার তা নাকচ করেছে। ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়তে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করলেও তা গৃহীত হয়নি। প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়তে পূর্বাচলে জমি কিনেছে। তবে রাজউকের ছাড়পত্র না পাওয়ায় নির্মাণকাজ শুরু করতে পারেনি।

এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক বিশ্বজিৎ চন্দ সমকালকে বলেন, দফায় দফায় সময় নিয়েও কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করা এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি বন্ধের সিদ্ধান্ত চলতি জানুয়ারি থেকেই কার্যকর হবে।
ইউজিসির পরিচালক (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়) ওমর ফারুক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে যেসব বিশ্ববিদ্যালয়কে তিন মাস সময় বেঁধে দিয়ে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার চূড়ান্ত নোটিশ করা হয়েছে, সেগুলো হলো- ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, সিটি ইউনিভার্সিটি, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি ও বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি। এসব বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের ক্যাম্পাসে যেতে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত সময় পাবে।

এগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি ঢাকার মোহাম্মদপুরের আদাবরে নিজস্ব ক্যাম্পাস করেছে। তবে ইকবাল রোডে অস্থায়ী ক্যাম্পাসেও সীমিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আর ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠা করলেও সেখানে এখনও বিদ্যুৎ সংযোগ পায়নি। একই কথা জানিয়েছে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটিও। জানা গেছে, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি বিশ্ববিদ্যালয় ফাউন্ডেশনের জমিতে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম (শূন্য দশমিক ২৫ একর) জমিতে ভবন নির্মাণ করে কার্যক্রম চালাচ্ছে। জায়গাটি কবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে হস্তান্তর করবে, তা বলছে না। ইউজিসি তাগাদা দিয়ে বলেছে, ৩১ মার্চের আগেই জমি ও ভবন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দ্রুত হস্তান্তর করতে।
আর ছয় মাস সময় পাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো- ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি এবং দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি। ইউজিসি বলেছে, আগামী ৩০ জুনের মধ্যে এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ক্যাম্পাসে না গেলে স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়া অন্য ক্যাম্পাস বা ভবনগুলো অবৈধ হবে, সেগুলোয় শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি নরসিংদীতে তাদের স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়েছে। তবে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য তাদের জমি অধিগ্রহণ ও ক্যাম্পাস ভাঙা পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছে ৩ থেকে ৫ বছর সময় চেয়েছিল। তবে এরই মধ্যে দফায় দফায় সময় বাড়ানোয় আর নতুন করে ৬ মাসের বেশি সময় দিতে চায়নি ইউজিসি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইউজিসিকে জানিয়েছে, তাদের ক্যাম্পাস প্রস্তুত প্রায়। জুনের মধ্যে তারা স্থানান্তর করতে পারবে। বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের ফার্মেসি বিভাগের ল্যাব স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের জন্য ৫-৬ মাস সময় প্রয়োজন হবে। ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) কর্তৃপক্ষ স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে আরও দুই বছর সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছিল। তবে ইউজিসি তাতে পাত্তা দেয়নি। তাদের ধানমন্ডিতে তিনটি অস্থায়ী ভবনের সাময়িক অনুমোদনের মেয়াদ গত ৩১ ডিসেম্বর শেষ হয়ে গেছে। ইউজিসি বলেছে, এসব ভবনে ১ জুলাই থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হলে তা অবৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে। গ্রিন ইউনিভার্সিটি ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করেছিল। তা নাকচ হয়েছে। ছয় মাস সময় পেয়েছে তারা। প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়তে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় চেয়ে আবেদন করলেও তা গৃহীত হয়নি। উত্তরা ইউনিভার্সিটি বলেছে, তারা স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়লেও সেখানে বৈদ্যুতিক কাজ বাকি রয়েছে।

এগুলোর বাইরে আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে ভর্তি বন্ধ ঘোষণা করেছে ইউজিসি। এ বিশ্ববিদ্যালয় দুটির শুধু স্থায়ী ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী ভর্তি করা যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় দুটি হলো মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও স্টেট ইউনিভার্সিটি। মানারাত আশুলিয়ায় ক্যাম্পাস গড়লেও গুলশানেও অস্থায়ী ক্যাম্পাস চালাচ্ছে।
২০২২ সালের ১১ মে ইউজিসি থেকে এই ১৮টিসহ মোট ২৩টি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে গত ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। এ সময়ের মধ্যে ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব ক্যাম্পাসে যেতে পেরেছে। সেগুলো হলো- ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নদার্ন ইউনিভার্সিটি, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া এবং ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব)।

বর্তমানে দেশে ১০৮টি সরকার অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। আইন অনুসারে ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক একর, অন্য এলাকার ক্ষেত্রে দুই একর জমি থাকতে হবে।
১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে ইউজিসির সর্বশেষ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, স্থায়ী ক্যাম্পাস ছাড়া একটা বিশ্ববিদ্যালয় চলবে কী করে? উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনের ব্যাপারে কোনো আপস করার সুযোগ নেই। যেসব প্রতিষ্ঠান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে না, তাদের ভর্তি বন্ধ করতেই হবে।