তিন কোটি পাঠ্য বই এখনো ছাপা বাকি


hadayet প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ২৮, ২০২৩, ৪:০৮ পূর্বাহ্ন / ৪১
তিন কোটি পাঠ্য বই এখনো ছাপা বাকি

বই উৎসবের ২৫ দিন পেরোনোর পরও দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের হাতে পুরোপুরি বই পৌঁছেনি।  জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) বলছে, ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট বইয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ ছাপা হয়ে গেছে। তবে শিক্ষা কর্মকর্তাদের গাফিলতিতে সঠিক সময়ে বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছেনি।

এদিকে সরেজমিনে ১৫ জেলায় গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ভেদে শিক্ষার্থীরা ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ বই পায়নি। দেখা গেছে, প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ের ঘাটতি বেশি। চলতি বছর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ৩৩ কোটি ৪৮ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৩টি বই বিতরণের কার্যক্রম চলছে। এনসিটিবির তথ্য অনুযায়ী, ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ৯০ শতাংশ বই জেলা শিক্ষা কার্যালয়ে সরবরাহ হয়েছে। এই হিসাবে সরবরাহ বাকি প্রায় সাড়ে তিন কোটি পাঠ্য বই। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, সার্বিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সরবরাহ হয়েছে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ বই। পাঠ্য বইয়ের অভাবে পাঠদান এখনো পুরোদমে শুরু হয়নি। পুরনো বই দিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করছেন শিক্ষকরা। তবে কয়েকটি শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম হওয়ায় পুরনো বই দিয়ে পড়াতে হিমশিম খাচ্ছেন শিক্ষকরা। এতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতি বাড়ছে।

যশোর সদর উপজেলার মুক্তেশ্বরী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. আব্দুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলে, ‘১০টি বইয়ের মধ্যে মাত্র তিনটি বই পেয়েছি। পুরনো বইয়ে লেখাপড়া হচ্ছে না।’ জানা যায়, সপ্তম শ্রেণিতেও বইয়ের সংকট চলছে। এই উপজেলার ভেকুটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে ছয়টি বইয়ের স্থলে দেওয়া হয়েছে তিনটি, পঞ্চম শ্রেণিতে দুটি।

একইভাবে চট্টগ্রাম, ভোলা, চাঁদপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝালকাঠি, মেহেরপুর, বাগেরহাটের শরণখোলা, ময়মনসিংহের ভালুকা, মাদারীপুরের রাজৈর, পটুয়াখালীর দুমকী, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, মোলভীবাজারের কুলাউড়া এবং বরগুনা ও বামনায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গড়ে ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ বই শিক্ষার্থীরা পায়নি।

১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত বই সরবরাহের হিসাবে দেখা যায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে এখনো তিন কোটির  বেশি বই সরবরাহ করেনি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো। এর মধ্যে মাধ্যমিকের সোয়া দুই কোটি এবং বাকিগুলো প্রাথমিকের বই। ওই সময় পর্যন্ত ২৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান মাধ্যমিকের দুই কোটি ১২ লাখ ৫৬ হাজার ১৬৩ বই সরবরাহ করেনি। সাত কোটি ১৯ লাখ ছয় হাজার ২৩১টি বই ছাপার কার্যাদেশ পেলেও ৭০.৪৪ শতাংশ বই সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো।

বই সরবরাহ তথ্যে দেখা যায়, ষষ্ঠ, সপ্তম শ্রেণিসহ ইবতেদায়ি প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির এক কোটি তিন লাখ ৪৩ হাজার ৯৭৬ কপি বই সরবরাহ করতে পারেনি ১৪ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে একটি বইও সরবরাহ করতে পারেনি এসআর মানিকগঞ্জ প্রিন্টার্স। এপেক্স প্রিন্টার্সে আটকে আছে ১৭ লাখ সাত হাজার ৯৪১ এবং অনুপমায় ১২ লাখ সাত হাজার ৫৮৭টি বই। অষ্টম, নবম শ্রেণিসহ ইবতেদায়ি তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির এক কোটি ৯ লাখ ১২ হাজার ১৮৭ বই সরবরাহ করতে পারেনি ৯ মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে বারোতোপায় ৫৭ লাখ ৮৭ হাজার ১১৪, ভয়গারে ১২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৫ ও আনন্দ প্রিন্টার্সে ১১ লাখ ৫৪ হাজার ৯২টি বই ছাপা বাকি।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাথমিকের কোনো বই সরবরাহ বাকি নেই। মাধ্যমিকের কিছু বই বাকি আছে, এগুলোর সরবরাহ আজকের (২৫ জানুয়ারি) মধ্যে শেষ করতে চেয়েছি। তবে এপেক্স, প্রমাসহ তিনটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান বই সরবরাহ করতে পারছে না। ছোট প্রেসগুলো সব বই সরবরাহ করলেও বড় প্রেসগুলোতেই কাজ আটকে আছে।’

বই সরবরাহে শিক্ষা কর্মকর্তাদের গাফিলতির উল্লেখ করে এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, ‘বই পাঠানোর পরও কেন বিদ্যালয়গুলোতে তা সরবরাহ করা হচ্ছে না, তা নিয়ে তদন্ত করছি। শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কাজে অর্থ নয়ছয়ের অভিযোগ পেয়েছি। উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে বিদ্যালয়গুলোতে বই পৌঁছে দিতে প্রতি বইয়ে ১৫ পয়সা দিচ্ছি। জানতে পেরেছি অনেক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রধান শিক্ষকদের আগমনের অপেক্ষায় থাকেন। তখন বই ধরিয়ে দেবেন। এসব স্কুলে আমাদের তদন্ত কমিটি যাচ্ছে। আগের তদন্ত কমিটির পাশাপাশি এনসিটিবি থেকে আরো ১২টি তদন্ত কমিটি বিভিন্ন জায়গায় পাঠাচ্ছি। কোথায় কেমন বই দেওয়া হচ্ছে, তা নিজেরা সরেজমিন করে দেখতে চাই। প্রাথমিকের ১০টি লট এবং মাধ্যমিকের আটটি লটের কাজ  ফের টেন্ডারের মাধ্যমে দেরিতে কার্যাদেশ দেওয়ায় তাদের থেকে বই পেতে কিছুটা সময় লাগছে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১ ফেব্রুয়ারির পর কারো কাছে বই থাকলে তা আমরা নেব না।’