
ইতিহাসের পাতায় একটি চিরন্তন সত্য বারবার প্রমাণিত হয়েছে কোনো দেশ কেবল যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধ্বংস হয় না; একটি দেশ ধ্বংস হয় তখন, যখন তার ভেতরের মানুষেরা দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা ভুলে কেবল নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। চারপাশের ধূলিঝড় আর ভাঙচুরের শব্দের আড়ালে একটি সুপ্ত কিন্তু তীব্র আর্তনাদ ভেসে আসছে “প্লিজ, একটু দেশপ্রেমিক হোন…”। এই আহ্বান কোনো দুর্বল চিত্তের অনুযোগ নয়, এটি ১৬ কোটি মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার এক পরম আকুতি।
দেশপ্রেম মানে শুধু জাতীয় পতাকাকে ভালোবাসা বা বিশেষ বিশেষ দিনে আনুষ্ঠানিক স্লোগান দেওয়া নয়। সত্যিকারের দেশপ্রেম হলো সংকটের দিনে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং রাষ্ট্রকে তার ভেতরের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করা। আজ আমাদের তেমনই এক সম্মিলিত জাগরণের সময় এসেছে।
জাতীয় ঐকমত্য ও জবাবদিহিতা: অর্থনীতির রক্তক্ষরণ বন্ধের পূর্বশর্ত
একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে “রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল।” বিগত দেড় দশক ধরে আমাদের দেশের অর্থনীতিতেও ঠিক তেমনই এক দৃশ্যপট মঞ্চস্থ হয়েছে। উন্নয়নের চটকদার ও মেকি বিজ্ঞাপনের আড়ালে দেশের ব্যাংকিং খাত এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে যেভাবে লুটেপুটে খাওয়া হয়েছে, তা এক কথায় নজিরবিহীন। একে একে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে, ভুয়া ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করে দেশের অর্থনীতিকে আজ সম্পূর্ণ ‘ফোকলা’ বা খোলসে পরিণত করা হয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চিলির অর্থনীতি যখন ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনতোষী পুঁজিপতিদের গ্রাসে ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, তখন তারা জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে বড় ধরনের সংস্কার শুরু করেছিল। আমাদেরও আজ সমস্ত রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে দেশের স্বার্থে এক বিন্দুতে মেলা প্রয়োজন।
উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যারা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করেছে এবং এই লুটপাটের প্রতিবাদ করায় যেসব অগণিত নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে, তাদের রক্তের দাগ এখনো শুকায়নি। যারা এই ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার মূল হোতা এবং যারা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নিজেদের বিলাসবহুল প্রাসাদ গড়েছে, তাদের বিচার যদি আজ নিশ্চিত করা না যায়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে দেশপ্রেমের মূল ভিত্তিটাই ধসে পড়বে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতা
দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে জুলাই সনদের সফল বাস্তবায়ন এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার সমমনা জোটের এই সনদের কিছু বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্ট) থাকলেও, অন্যান্য সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনাকে সমুন্নত রাখতে যেকোনো রূপে ফ্যাসিবাদী ও একদলীয় চিন্তাধারার শক্তিকে তা প্রকাশ্যেই হোক বা গোপনে কোনো প্রকার রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়া হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এদের দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা হবে অভ্যুত্থানে শহীদ ও পঙ্গুত্ব বরণকারীদের সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা। একইসঙ্গে, জুলাই আন্দোলনের কিছু নেতার বিরুদ্ধে নীতিভ্রষ্টতার যে অভিযোগ উঠেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে উঠে জুলাই সনদের যথাযথ রূপায়ণই হবে আগামী দিনের সুষ্ঠু রাজনীতির মূল ভিত্তি।
‘কিচেন ক্যাবিনেট’ ও গুপ্ত চুক্তি: সার্বভৌমত্বের অবমাননা
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার স্বচ্ছতা এবং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, বিগত বছরগুলোতে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল চাবিকাঠি চলে গিয়েছিল এক অদৃশ্য ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা গুপ্ত চক্রের হাতে। পর্দার আড়ালে বসে এই চক্রটি এমন সব গোপন চুক্তি সম্পাদন করেছে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদি সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতাকে বন্ধক রেখেছে।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯ শতকে লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশ এমনই কিছু গোপন চুক্তির কারণে বহুজাতিক কোম্পানি এবং স্বার্থান্বেষী মহলের দাসে পরিণত হয়েছিল, যা পরবর্তীতে তাদের দেউলিয়া করে ছাড়ে। আমাদের মাতৃভূমিকে সেই পরনির্ভরশীলতার খাঁচায় বন্দি হতে দেওয়া যাবে না। এই গুপ্ত চুক্তির হোতাদের মুখোশ উন্মোচন করে বিচারের মুখোমুখি করা আজ সময়ের দাবি।
আপনার মতামত লিখুন :